শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১০

শিরোনামহীণ অন্ধকার

নোনা ধরা দেয়ালে সেইসব চোখ
নানা রঙ্গীন আলো ফেলে চলে।

উড়ে চলে যায় সাদা তেলাপোকার দল
সারি সারি খোলস ফেলে রেখে
মেঝে আর দেয়ালের মোহনায়।

ঘুম ঘুম দিন জুড়ে সামরিক পিপড়ের দল
হেঁটে বেড়ায়,
অসুস্থ্য আঙ্গুলের ঘ্রাণে সম্মোহিত বরফকুচি ও কনিয়াক গ্লাস
ছায়া ফেলতে থাকে মানবিক চোখের নীচে।

সন্তানেরা একে একে নেমে যায় মৃত্যুর অতলে
নরমুন্ড শিকারীর উল্লাস
ছড়িয়ে যায় সবুজ ঘাসের মেঘে
নদীরা জেগে ওঠে রক্ত পান করে।

বিছানায়, চাদরে লেখা থাকে নির্জীব প্রাণীজ সঙ্গম।

বুধবার, ৬ অক্টোবর, ২০১০

****

*
ছন্দবদ্ধ কার্ণিশ বেয়ে নেমে আসে হলদে রোদ। ঘাম জমে ওঠে শরীর সমতল জুড়ে। ঘোলাটে মনের আনাচ কানাচে যেসব ঘাসের বসবাস, তারা আলোড়িত হয় বাতাসের প্রতীক্ষায়। বাতাসের সাথে ডুমুর ফুলের বন্ধুতা বাড়ে। মুখে হাসি, চোখে জল নিয়ে এলোমেলো উড়ে যায় নাগরিক কাকের দল।

**
ছন্নছাড়া। ছন্নছাড়া।
জীবন নিয়ে হেঁকে চলে ফেরিওয়ালা। কিনবার মত লোক খুঁজে ফেরে এখানে ওখানে। মেলেনা। চাহিদা নেই তাই ছন্নছাড়া জীবন পড়ে থাকে টিনের কৌটোতে কিংবা বাঁশের ঝাঁকায়। শোঁ শোঁ করে গাড়ি হাঁকায় গোছানো জীবনের বিক্রেতারা। তাদের কাঁচের শো-কেসে রাখা প্রোডাক্টের চাহিদা প্রচুর। সারাক্ষণ সারিসারি ক্রেতাদের আসা-যাওয়ায় মসৃণ হতে থাকে কংক্রীটের আবরণ।

***
আয়নায় তাকিয়ে চোখ রাঙানী দেখি নিজের। নাঃ। রাতজাগা ক্লান্তি ভর করা নেই চোখে, নেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। খুব সাধারণ একটা অসুখ ভর করেছে চোখে। সময়টাই এরকম। চোখের অসুখ, মনের অসুখ খুব সহজেই সংক্রমিত হয়ে পড়ে। চোখ থেকে চোখে। মন থেকে মনে।

****
একটা সময়ের পরে বিবাহিতদের ভিতরে আর আবেগ টিকে থাকে না। দু'জন দু'জনকে মানসিক ভাবে ঘায়েল করার চেষ্টায় মেতে থাকে সারাক্ষণ। এই আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি কথা, দেখি কেমন তোমার এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা? সময় পার হয়। স্বর পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকে। একপর্যায়ে অত্যাধিক উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতা জনিত কারণে থেমে যায় দু'টো স্বর ই। জমে ওঠে নীরবতার বরফ।

সোমবার, ৪ অক্টোবর, ২০১০

ক্রমশঃ

তরল।
হৃদয়ের দ্রুতগতি।
দু'কানের পাশ দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া।

আগুন।
ফুসফুসে কালো অবক্ষেপ।
হৃদয়ের দ্রুততর গতি।

আলো।
চোখের মনির ধীর লয়।
দু'কানের ক্রমশঃ পাখা হয়ে ওঠা।

মেঘ।
ফুসফুসে গারবেজ ডাম্পইয়ার্ড।
শরীরের কাশফুলে রুপান্তর।

সমুদ্র।
জামা জুড়ে নোনতা স্বাদ।
ধীরলয়ের চোখে জমা বৃষ্টি।


একটা নোনা শরীরের ক্রমশঃ কাশফুল হয়ে ওঠা পেগাসাসের পাখায় ভর দিয়ে।
অতঃপর।
ভাসমান কাশফুল পার হয়ে যায় সকল বাঁধা।

বৃহস্পতিবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১০

হাতুড়ে গদ্য- অন্ধকার এবং ঘন্টার টুং টাং

ঘন্টার টুং টাং শব্দ অন্ধকারে পুকুরে একেকটা করে রঙ ছুঁড়ে দেয়। আর রঙের আলোতে আলোকিত হয়ে ওঠে সময়গুলো।



টুং... অন্ধকারের ভিতরে একঝলক সবুজ গন্ধ নিয়ে ছুটে এলো সময়।
অনুপমা বসে আছে বই হাতে। গায়ে জড়ানো কলাপাতা আর সাদা চেককাটা সুতির শাড়ী। মাথাটা একটু কাত করে বইয়ে ডুবে আছে সে। আলতো হাসির ছোঁয়া ঠোঁটের কোনে। শুভ্র একটু দূরে বসে তাকিয়ে আছে অনু’র দিকে।
-শুনছো, আমাকে একটু পানি এনে দেবে?
শুভ্র পানি নিয়ে এসে দেখে অনু’র চোখ ছলছল।
=কি হয়েছে তোমার? এই দেখে গেলাম হাসি, এই কান্না?
-তুমি কি বই টই পড়া বাদ দিয়ে দিয়েছো? সারাক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকো?
=তোমাকে পড়তে পড়তেই তো আমার সময় চলে যায়, বই পড়ার কোনো ইচ্ছেই জাগে না।
-তুমি না...


টাং... অন্ধকারের ভিতরে একঝলক হলদে রোদের পরশ নিয়ে এলো সময়।
নিজের অফিস শেষে শুভ্র অনু’র অফিসের দিকে দ্রুতপায়ে। দূর থেকে চোখে পড়লো অনুকে। অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কারো কথায় হেসে কুটিপাটি।
কেন কেন কেন?
শুভ্রর ভিতরে দুপুরের গনগনে সুর্য উত্তাপ ছড়ায়।
নিয়মিত কেন অভির সাথেই দাঁড়িয়ে থাকবে অনু? আরও অনেক ছেলেই তো আছে অনুর অফিসে? কেন এভাবে হাসবে অভির কথায়? অভিই বা কেনো ছুটির দিনগুলোতে তাদের বাসায় আসবে? কেন অভিই?
সন্ধ্যাবেলাতেও শুভ্রর ভিতরে দুপুরের হলুদ রোদ উত্তাপ ছড়ায়। মনে মনে তেতে ওঠে আর শরীর জুড়ে বয়ে যায় ঘামের নদী।

টুং... নীলাভ নিয়নের সময় অন্ধকার কে পাশ কাটায়।
=অভির সাথে এতো কিসের মাখামাখি?
-মাখামখি মানে? ছেলেটা আমার ওয়েল উইশার।
=তো কিসের ওয়েল উইশ করে শুনি?
-সেটা তো আমিও জানতে চাইতে পারি।
=মানে?
-যেদিনই লাঞ্চে তোমার অফিসে যাই, শীলাকে দেখি তোমার ডেস্কে বসা?
=আরে, ও আমার কলিগ। আমার কাছে কাজ তো থাকতেই পারে। নাকি?
-কেমন কাজ সেটাতো বুঝতেই পারছি। আমি গেলেই কাজ শেষ হয়ে যায় তাইনা? মুখ কালো করে উঠে যেতে হয় ডেস্ক ছেড়ে?
=দেখো তুমি কিন্তু অভার রিয়্যাক্ট করছো।
-ও, তুমি করলে কিছু না। আমি অভির সাথে তোমার অপেক্ষায় দাঁড়ালেই আমাদের ভিতর কিছু চলছে?
=দেখো আমি কিন্তু এরকম কিছু বলিনি। তোমার মুখ দিয়েই বের হ’লো।
-তুমি সরাসরি বলনি, কিন্তু এরকমই তো মিন করেছো।
=তাইতো হবে। চোরের মন তো পুলিশ পুলিশ।
-তুমি আমাকে চোর বলছো? তুমি কি? ঘরে বউ থাকা সত্তেও আরেকটা মেয়ের সাথে যে সম্পর্ক চালাচ্ছো?
=না জেনে কিছু বলোনা বলছি।
-আমার আর জানতে হবে না। আমার বোঝা হয়ে গেছে তুমি কতটা সাধু পুরুষ। আমি যখন মায়ের বাসায় যাই তখন অই শীলাকে বাসায় নিয়ে আসো তাই না?
শুভ্র নিয়নের নীল আভাটাকে অনু’র গালে এনে বসিয়ে দিয়ে মনটাকে অন্ধকার করে ফেলে।


টাং... লাল রক্তের আঁশটে গন্ধ জমে ওঠে সময় কে ঘিরে।
শুভ্রর চিন্তা চেতনায় অনু-অভির সম্পর্ক। মাথার ভেতরে লালের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে চলে সারাক্ষণ। রক্ত ছুটে চলে শিরা ও ধমনী বেয়ে। দ্বিগুন বেগে।
হয় অভি, নাহয় অনু।
দুজনের একজনকে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতেই হবে। সিগারেটের লাল আগুনের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত খুঁজে চলে শুভ্র।
হয় অভি, নাহয় অনু।
অনুপমাই। কিন্তু কিভাবে?
গলায় ওড়না পেঁচিয়ে? নাকি ব্লেড দিয়ে রগ কেটে ফেলে? নাকি ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে?
ব্লেড। লাল। রক্ত। দায় এড়ানো?
দু’দিন পর অফিসের কাজে যেতে হবে শহরের বাইরে। অফিস জানবে কালকেই রওনা হবে, বাসাতেও তাই। মাঝপথে নেমে যাবে, জরুরী কাগজ আনতে ভুলে গেছে বলে। ফিরে আসবে বাসায়। এসে দেখবে অনুপমা মৃত পরে আছে শোবার ঘরে। পরনে কলাপাতা রঙের শাড়ীটা।




:::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::::
শুভ্রর নীল টি-শার্টটা রক্তের ছোপ লেগে কালো হয়ে গিয়েছে।
অনু চাকরী ছেড়ে কোথায় চলে গিয়েছে। কেউ কোনো খোঁজ জানে না।
অভিকে ইদানীং শীলার সাথে এখানে ওখানে ঘুরতে দেখা যায়।

সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১০

গিফট

অনেক দিন পর একটা গিফট এসেছে এই ঠিকানায়।

গোলাপী রঙের র‍্যাপিঙ পেপারে মোড়ানো একটা বাক্স।
র‍্যাপিঙ পেপারের উপরে ছোট ছোট লাল রঙের হৃদয়ের চিহ্ন
এক কোনে আবার বেশ আর্টিস্টিক ধরণের ডিজাইন করা।
প্রেরকের নাম লেখা ট্যাগটা কিছুটা ফুলের মত আকৃতির, সবুজ রঙের
প্রাপকের নাম লেখা আছে সাদা জমিনে, কালো কালিতে, আয়তাকার একটা কার্ডে।
চেনা নাম দেখে আগ্রহ বেড়ে ওঠে
বক্সটা খোলার উদগ্র একটা বাসনা জেঁকে ধরে।

ব্যাস্ত হাতে ছিঁড়ে ফেলি গোলাপী র‍্যাপিঙের আবরণ।
ভেতরে হলুদ কাগজের যে বাক্সটা
যেনো চারকোনা একটা হলুদ সূর্য,
অমোঘ আকর্ষণে ডাকছে কোনো গ্রহাণুকে।

আবার ক্ষীপ্র হাতে খুলে ফেলি হলুদ কাগজের বাক্স
উৎসুক দৃষ্টি ছুঁড়ে দেই ভিতরে।
দেখি ভাঙা কাঁচের টুকরো দিয়ে তৈরী বিছানায়
নিশ্চুপ শুয়ে আছে,
একটা হৃদয়।

কোনো এক সময় তোমাকে দেয়া আমার উপহার।

রবিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০

অশিরোনাম পংক্তিমালা

*
জোছনার জল বেঁধে দেয় গরাদহীন গন্ডী
ভেতরে বসে কেউ একজন
স্মৃতি এঁকে চলে ধোঁয়ার মেঘে।

**
তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম,
একান্ত ভাবে
নিবিড় করে।
উচ্ছল হেসে,
রেখে গেলে তীব্র ব্যাথাজাগানিয়া রাত।

***
তৃষিত ছিলে আশৈশব।
মধ্যাহ্নে, সুপেয় জল হাতে দাঁড়িয়েছিলাম।
সন্ধ্যা এলো,
নেশাতুর পায়ে এগিয়ে গেলে গভীর রাতের পানে।
জল, মধ্যাহ্ন, ছায়া...
ভুলে যাওয়া আসলে খুবই সহজ।

বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১০

ভালোবাসার সঙ্গোপন শ্যাওলা

মনের,
সঙ্গোপন কোনে জমে ওঠা ভালোবাসার শ্যাওলা
ধুয়ে মুছে তকতকে করে ফেলি নিরুচ্চারে।
শ্যাওলা কিংবা মনের চিৎকার
শুনতে পাইনা,
কিংবা জানতে চাইনা।
কালো চশমায় চোখ রেখে,
বৃষ্টির পথ ঢেকে দিতে চাই অপ্রাসংগিক রোদেলা দুপুরে।
প্রানবন্ত আচরণে ভরে তুলি
দশ দিকে ছড়িয়ে থাকা বিষাদ পাত্রের শুণ্যতা।

তবু,
পাতার ফাঁক গলে নেমে আসা জোছনা
খেলা করে একই মনের কোনে, জল জমা শ্যাওলায়।