গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০১৫

পুনঃশ্চ, শ্রীময়ী... [৩]

প্রিয়তম শ্রীময়ী,

মানুষ কিভাবে বদলায়, তাইনা! কি দ্রুততার সাথে বদলে যায়...


উপেক্ষা জিনিসটা কষ্টের। দুই তরফেই। যাকে উপেক্ষা করা হচ্ছে আর যে উপেক্ষা করছে দু'জনেই ক্লিষ্ট হয়ে থাকে উপেক্ষার ভারে...

আসল সত্যটা কি তেমনই, যেমনটা সেদিন বলেছিলে? সেদিনের পর থেকেই যে তোমাকে বদলে যেতে দেখলাম...

অপ্রয়োজনে কথা বললে তোমার সাথে, তুমি কি খুব বেশী বিরক্ত হও? ভাবো, আঙুল গোনা কটা দিন আগেই অপ্রয়োজনে কত কত কথা বলতাম আমরা দু'জন। সবই অতীতের গল্প মনে হয়...

কিছুমাস আগে তুমি কাগজে লিখে দিয়েছিলে "ওয়ান ডে ইউ'ল গেট লস্ট"। হিডেন মেসেজটা কি এমন ছিলো? "ওয়ান ডে আই'ল আস্ক ইউ টু গেট আউট অফ মাই লাইফ অ্যান্ড ইউ'ল গেট লস্ট ফর এভার"...

ভালো থাকো শ্রীময়ী, সারাজীবন। অনেক বেশী ভালো থেকো প্রাচুর্যের খাঁচায় বসে...

...অসীম প্রাচুর্য ঘিরে রাখুক তোমাকে সারাটা জীবন। আমার মতো ওয়ার্থলেস মানুষের সাথে এতদিন ছিলে, এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া... 

ইতি,
তোমারই আমি...

বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৫

শ্রীময়ী, তোমাকে... [১৫]


প্রিয়তম শ্রীময়ী,

কেমন আছো তুমি? কতদিন লিখিনা তোমায়! উঁহু, ভুলেও ভেবোনা যে ভুলে গিয়েছি। তোমাকে ভুলে যাওয়া মানেতো নিজেকেই ভুলে যাওয়া...

সময়ের মোর্স কোডে আটকে যাওয়া সময়টাকে নিয়ে হেঁটে চলি দুজনেই। ডট ড্যাশ ডট ডট ড্যাশ ড্যাশ ড্যাশ ডট ডট ডট ড্যাশ ডট...

তুমি ওপারে দাঁড়িয়ে বুঝেও না বোঝার ভাণে, এঁকে রাখো দুর্বোধ্য গ্রাফিতি। আমি এপারে অনুবাদ করি হায়ারোগ্লিফ...

জানো শ্রীময়ী, তুমি পাশে আছো জেনে চোখ বুঁজে পাড়ি দিই অনিশ্চয়তার হিমালয়। নিশ্চিত জানি পেরোতে পারবোনা, তবুও...

উপেক্ষার আলিঙ্গনে জোছনারা মরে যেতে থাকে নৈমিত্তিক রাতের প্রহরে। আবার সকাল হলেই পূর্ণ চাঁদের আসা যাওয়া...

পাখিমাত্রই অভিমানি...

আস্থা রেখো শ্রীময়ী, আমাদের যুক্তিহীন স্বপ্নের উপর। স্বপ্নেরা সত্যি হয় ওঠে আস্থার আবরণে...

ইতি,
তোমারই আমি...

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৩

পৌনঃপুনিক

অক্টোবর ১৬, ২০১২ - ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন 

মৃদুল প্রতিদিন তিনতলার সিঁড়ির কোনায় দাঁড়িয়ে থাকে, একটা নীল বেলুন হাতে।

........................

শোভনা প্রতিদিন তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে, কাঁধে থাকে একটা সাদা ব্যাগ।

........................

পুরোনো ধাঁচের তিনতলা এই বাড়ীটায় সিঁড়িগুলো অনেক উঁচু উঁচু আর অন্ধকার। অন্ধকার ঠিক না, আলো কম। তবে ঘন্টা খানেক দাঁড়ালে চোখ সয়ে আসে, সবকিছু দেখা যায়। শুধু রঙ আর আকারের কোনো থই পাওয়া যায় না।
মৃদুল অপেক্ষা করে শোভনার জন্যে।
শোভনা ক্লান্ত পায়ে এক একটা সিঁড়ি ভাঙ্গে, মৃদুল পায়ের শব্দ গোনে। শোভনার সাদা ব্যাগটা ঝলমল ঝলমল করে। মনেহয় এক খন্ড সুর্য নিয়ে সে ঢুকেছে অন্ধকার সিঁড়িঘরে। সেই সুর্যকে নীল মেঘ দিয়ে বরণ করে নিতেই মৃদুল দাঁড়িয়ে থাকে নীল বেলুন হাতে।
শোভনাও অপেক্ষা করে মৃদুলের সাথে দেখা হবার ক্ষণটার।
দু'জনে মুখোমুখি হয় তে'তলার ল্যান্ডিংএ। মৃদুল ঠোঁট আর চোখে হাসি নিয়ে শোভনার দিকে বেলুনটা বাড়িয়ে দেয়, শোভনাও চোখ আর ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে দুহাতে বেলুনটা ধরে।
আর বেলুনটা অদৃশ্য হয়ে যায়।
মৃদুল সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায় নীচে, শোভনা নিজের বাসার দরজায় কড়া নাড়ে।

..................

..................

মৃদুল প্রতিদিন তিনতলার সিঁড়ির কোনায় দাঁড়িয়ে থাকে, একটা নীল বেলুন হাতে।

........................

শোভনা প্রতিদিন তিনতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে, কাঁধে থাকে একটা সাদা ব্যাগ।

........................

ফেরার গল্প

আগস্ট ২৫, ২০১২ - ১১:১৯ পূর্বাহ্ন 

এখানে একটা সত্যিকারের পুকুর ছিলো। আর কেউ না মনে রাখলেও আমি সেটা মনে রেখেছি। সেই পুকুর পাড়ে কত শত উদাসী দুপুর যে কাটিয়েছি ভাবলেই এই খড়খড়ে রোদের দুপুরটাও বেশ মায়াময় হয়ে ওঠে। আমি অনেকদিন পরে এই রাস্তায় ফিরছি। ঐ যে ওখানে একটা বিষণ্ণ আতাগাছ দেখছেন, ওটার পাশের গলিটা দিয়ে পঞ্চাশ গজ মত গেলেই আমার বাড়ী। কিংবা বলতে পারেন আমার বাড়ী ছিলো। এখন কেউ আছে কি না, সেটা জানা নেই।
একবিন্দুও বাড়িয়ে বলছিনা, আমি আসলেই ফিরে এসেছি। যদিও চেনা রাস্তাটা আর আগের মতো চেনা নেই। কালাম মামার চা সিগারেটের দোকানটা যেখানে ছিলো, সেখানে একটা কিম্ভুত আকৃতির হাইরাইজ দেখছি। কে জানে, কালাম মামাই এটার মালিক কি না।
এই যে লাল ইটের নোনাধরা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, এখানে থাকতো রচনা'রা। তবে এই বাড়িটা এরকম ভাঙ্গাচোরা ছিলোনা তখন। এই পাড়ার সবচে' আধুনিক বাড়িটার এমন হতশ্রী দশা দেখে বুক হু হু করে উঠছে। একসময় রচনার সাথে একটু কথা বলতে পারলে তাদের বাসার লনে খানিকক্ষণ খেলাধুলা করতে পারলে পাড়ার কিশোরদের কাছে নিজেকে অনেক বড় লাগতো। কামরুল কিংবা নওশাদের সাথে যদি রচনা বেশী সময় কথা বলতো, তাহলে কিশোর বুকে চিনচিনে ব্যাথা হ'তো। সেই দিনগুলোও কতদুরে ফেলে এসেছি...
একদিন রচনার বিয়েও হয়ে গিয়েছিলো তার বাবার মতই এক ব্যবসায়ীর সাথে। তরুন আমি, কামরুল, নওশাদের জন্য সেদিনটা ছিলো অনেক কষ্টের। গাড়ি চেপে বরের বাড়িতে রচনা চলে যাবার পর আমরা তিন বন্ধু মিলে সারারাত একসাথে হেঁটেছিলাম। কেউ কোনো কথা বলিনি, শুধু একের পর এক সিগারেট পুড়েছিলো আমাদের হাতে।
কামরুলরা এই পাড়া ছেড়েছিলো তার কিছুদিন পরেই। আর কোনো খোঁজ পাইনি ওদের। নওশাদ এখানেই ছিলো। ঐ যে বাঁ পাশে টিনের চাল ওয়ালা ঘরগুলো উঠেছে, ওটা ছিলো নওশাদদের উঠোন। একটা বিশাল আমগাছ ছিলো উঠানে। নওশাদের মা এই আমগাছের আম দিয়েই প্রতি বছর আমসত্ত্ব বানাতেন। আমরা ছিলাম তার রাক্ষস কুল।
সময় অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিলো, সাথে নওশাদটাও অনেক যাযাবর হয়ে গিয়েছিলো। আমি চাকরী পাবার অল্প কিছুদিন আগে নওশাদ একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করলো। কোন মেয়ে নাকি ওকে প্রত্যাখান করেছে তাই। সেই যাত্রা বেঁচে ওঠার পর, নওশাদের মা ওকে ধরে বিয়ে করিয়ে দিলো। কেয়া ভাবী দারুণ একজন মানুষ ছিলেন। নওশাদকে একটানে যাযাবর থেকে গৃহস্থ বানিয়ে ফেলেছিলেন। সব পাগলামি ঝেড়ে ফেলে নওশাদ নিজের ব্যবসা শুরু করলো, আর বছর না ঘুরতেই মিষ্টি একটা ছেলের বাবাও হয়ে গেলো।
আহ! আমার ফিরে আসার গল্প বলতে গিয়ে দেখি বিশাল কাহিনী ফেঁদে বসলাম। যাক্‌, আমিও মোটামুটি দু'-তিন বছর চাকরী করে মা-বাবার চাপে পড়ে লোপাকে বিয়ে করে ফেলি। নিজের স্ত্রী বলে বলছি না, লোপার মত মেয়েকে পাওয়া আমার সাত জনমের ভাগ্য ছিলো। অন্যের বাবা-মা কে কেউ এভাবে আপন করে নিতে পারে, আমার জানা ছিলোনা। আর আমার বাবা-মা? তারাও লোপাকে পেয়ে যেনো নিজের হারানো মেয়েকে খুঁজে পেলো। বলতে বোধহয় ভুলে গেছিলাম, আমার একটা বড় বোন ছিলো। আমার জন্মের পরপরই, মাত্র তিন দিনের জ্বরে ভুগে মারা যায়। যা হোক, লোপার কথা বলছিলাম।
লোপার সাথে আমার বিয়ের মাত্র সপ্তা দুই আগে পরিচয়। মুরুব্বীদের প্রাক বিবাহ কথা বার্তা শেষ হবার পরেই আমি মেয়েটাকে দেখি। দুই সপ্তাহে একটা মানুষকে আর কতটুকু চেনা যায়? সবকিছু ঠিকঠাক বুঝে ওঠার আগেই দেখি সাজগোজ করা একটা শ্যামলা মেয়ে আমার ঘরে বসে আছে। নিতান্ত ছাপোষা আমি আরো বেশী গৃহী হয়ে গেলাম। এরপরের সাতটা বছর কিভাবে চলে গেলো বুঝতেই পারিনি। লোপার সাথে কখনো কথা কাটাকাটি, মন কষাকষি হয়নি সেটা বলবোনা। কিন্তু প্রতিবারই কিভাবে কিভাবে জানি সব কিছু মিটে যেতো।
এই সাত বছরে লোপা আর আমার একটা মেয়ে হয়েছিলো। দুজন মিলে অনেক আলোচনা-ঝগড়াঝাটি করে নাম রেখেছিলাম শ্যামা। মেয়েটার মায়াময় মুখের কথা ভাবতেই চোখে পানি চলে আসলো। আমার শ্যামা যদি বেঁচে থাকে, কেমন দেখতে হয়েছে? কি করছে? কিছুই জানিনা। আর জানবোও বা কিভাবে? কতদিন পর ফিরছি এই রাস্তায়, আমার বাড়ীর রাস্তায়।
এইযে, সুশীল কাকুর সেলুন পার হচ্ছি। আরে! এখানেতো সেলুনই নেই এখন। একসময় বাবার হাত ধরে আসতাম চুল কাটাতে, বড় হয়ে ওঠার পর একা একাই। আবার শ্যামার প্রথম চুল কাটানোর জন্য সুশীল কাকুকেই ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভয় পেতাম, এত নরম চামড়া, যদি কেটে ছড়ে যায়? সুশীল কাকু থাকতেন আরেকটু সামনে গিয়ে ডানের বাড়িটায়। বাবার সাথে উনার ছিলো বন্ধুর মত সম্পর্ক, পুজো পার্বণে উনাদের বাসায় কত নাড়ু সন্দেশ খেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।
আমাদের বিয়ের চার বছরের মাথায় বাবা মারা গেলেন হঠাৎ করেই। মা ও শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। সাজানো পৃথিবী অনেকটাই এলোমেলো হয়ে পড়লো। এর ভেতরেই বাবার মৃত্যুর পাঁচ মাসের মাথায় মা ও চলে গেলেন বাবার সান্নিধ্যে। নিজের নাতনীর মুখ দেখে যেতে পেরেছিলেন এটাই স্বান্তনা। আমি মনে হয় একটু বদলেও গিয়েছিলাম তখন। অনেক দিনের ছায়া মাথার উপর থেকে সরে যাওয়ায় অনেকটা অবিন্যস্ত। তবুও সামলে নিচ্ছিলাম নিজেকে আস্তে আস্তে।
এইতো বিষণ্ণ আতা গাছটার কাছে চলে এসেছি। এবার বাঁয়ে মোড়, তিনটা বাড়ী পার হ'লেই আমার বাড়ী। আহা কতদিন আমার মেয়েটাকে দেখিনা, লোপাকেও। মেয়েটা মনেহয় অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। এতদিন পর আমাকে দেখে কি চিনতে পারবে? যে হারে মুখ ভর্তি সাদা সাদা দাঁড়ি-গোঁফ হয়েছে! লোপার চুলেও মনেহয় পাক ধরেছে। কিন্তু আমি ঠিকই চিনতে পারবো ওদেরকে। নিশ্চই চিনতে পারবো আমার হৃদপিণ্ডের ধুক ধুক শব্দগুলোকে।
সেবার, শ্যামার তিন বছরের জন্মদিন সামনে চলে এসেছে। আমি আর লোপা ঠিক করলাম মেয়েটাকে সাগর পাহাড় এগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। লোপা আর শ্যামা'র সে কি উচ্ছাস। মহা উৎসাহে শ্যামাকে নিয়ে লোপা বেড়ানোর প্রস্তুতি নিতে থাকলো, আর আমি ব্যাস্ত থাকলাম ছুটির আগে শেষ মূহুর্তের কাজ গুলো নিয়ে। রওনা দেবার আগের দিন দুপুরে, অফিস থেকে বেরোবো বেরোবো করছি, এমন সময় আমার ফোনটা বেজে উঠেছিলো। জরুরী কোনো একটা খবর ছিলো, যেটা এখন আর মনে নেই, শুনে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম অফিস থেকে।
এইতো আমার বাড়ীতে পৌছে গিয়েছি।
কিন্তু... এরকম ময়লা জমে আছে কেন গেটের সামনে? ঘরের দরজা জানালাগুলো একটাও আস্ত নেই কেন? লোপা শ্যামা ওরা কি আমার উপর রাগ করেছে গত আঠারো বছর ধরে যোগাযোগ নেই বলে?
আহ! সব কথা মনে পড়ায় এত এত কষ্ট লাগে কেনো। সারাবছরই তো ভুলে থাকি, মেয়েটার জন্মদিন কাছিয়ে আসলেই মনে পড়ে কেন সব কিছু...
আমার শ্যামা... আমার লোপা... বাসায় ফিরছিলো টুকিটাকি কিছু জিনিস কিনে। পথে ওদের রিকশাটাকে ধাক্কা দিয়েছিলো একটা কার। মেয়ে কোলে লোপা ছিটকে পড়েছিলো রাস্তায়, আর একটা বাস চলে গিয়েছিলো ওদের কোমল শরীর দু'টোকে পিষে দিয়ে।
সারা বছর পথে পথে ঘুরি আমি। সেই বাসটা আর কারটাকে খুঁজি। অন্য কিছু মনে থাকে না। শুধু শ্যামার জন্মদিনের আগে আগে মনে পড়ে ওদের সাগর আর পাহাড়ে নিয়ে যাবো বলেছিলাম। ফিরে আসি এই রাস্তায়...

অসংলগ্ন

আগস্ট ৬, ২০১২ - ১১:৪১ অপরাহ্ন

একটা নদীর মৃত্যু হয়েছে সেদিন...
আলফেসানী দাঁড়িয়েছিলো একটা রিকশা কখন এসে টুনটুন নুপুর বাজাবে সেই অপেক্ষায়। সেই রিকশাই এলো, সাথে করে নুপুরের ছন্দের বদলে নিয়ে এলো নদীর মৃত্যু সংবাদ। নদীটার সাথে আলফেসানীর পরিচয় ছিলোনা। শুধু ঢেউয়ের ছন্দটা সে দেখেছিলো কোনো এক আর্ট গ্যালারীর আলো আঁধারীতে।
ঝাঁক বেঁধে দানবেরা ছুটে এসেছিলো মৃত নদীর দৃশ্যমান সম্পদ ছিঁড়ে খুঁড়ে নেওয়ার জন্য। যেটা আলফেসানীর একেবারেই পছন্দ হয়নি। তাই সে জবথবু হয়ে বসে পড়লো গ্যালারীর অন্ধকার সিঁড়ির নীচে। যেখানে তৈলচিত্রদের বৃদ্ধাশ্রম। হঠাতই অন্ধকার ভরে উঠলো ফিসফিস স্বরে। শুনবেনা শুনবেনা করেও আলফেসানী শুনে ফেললো বৃদ্ধ তৈলচিত্রদের একান্ত গোপন কথাগুলো। এর ভেতর কোনো একটা তৈলচিত্র আবার সানাই বাজিয়ে চলেছিলো অবিরাম।
মাথার ভরা সানাইয়ের সুর নিয়ে আলফেসানী যখন জেগে উঠলো, তখন তৈলচিত্রদের কথাবার্তা তার কিছুই মনে নেই। শুধু সকাল সকাল নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার তাগিদ আর পাগল করা সানাই। কোন ভোরে জানি একটু বৃষ্টি নেমেছিলো, তার পরশ রয়ে গেছে এবরোথেবরো রাস্তায়। তাই সাবধানেই হাঁটছিল আলফেসানী, তবু কাদারা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরছিলো তার জুতো। অনেকটা দূর হেঁটে এসে পার্কের বেঞ্চিটাকে সে জিজ্ঞাসা, করলো এখানে বিশ্রাম নেওয়া যাবে নাকি? খুব পুরোনো বন্ধুর মত পার্কের বেঞ্চিটা একটা অশ্লীল রসিকতা করে বসলো। আলফেসানীর মাথা থেকে সানাইয়ের সুরগুলো দ্রুতপায়ে ছুটে গেলো পার্কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা থাকা পাতাদের আশ্রয়ে। আর ভারমুক্ত আলফেসানী বসে পড়লো বেঞ্চিটার শরীরে শরীর লাগিয়ে।
চোখের নাগালেই শাড়ি ছড়িয়ে নগ্ন শুয়েছিলো লেকটা। আলফেসানীকে এতো কাছাকাছি দেখেও তার ভেতর কোনো বিকার দেখা গেলোনা। বরং সে আলফেসানীর কাছে জানতে চাইলো, গত সন্ধ্যায় তৈলচিত্ররা তার নগ্নতা নিয়ে কিছু আলাপ করেছিলো কি না? লেকটা কষ্ট পাবে জেনেও আলফেসানী সত্যি কথাটা গোপন করতে পারলোনা। সে বলে দিলো, গতরাতে তৈলচিত্রদের আলোচনার বিষয় যদিও নগ্নতা ছিলো কিন্তু তাতে পরিচিত কোনো লেক বা নদীর প্রসঙ্গ ছিলোনা। অনেক দূরের কোনো এক সবুজ বনের নগ্নতায় বারবার উত্তেজিত হয়েছিলো বৃদ্ধ তৈলচিত্রেরা। আলফেসানীর কথা শুনে লেকটা তাড়াতাড়ি নিজের শরীর শাড়িতে ঢেকে নিলো। এর পরপরই পার্কটা কেমন জানি ধুসর হয়ে উঠতে থাকলো। শালিক, কাক আর চড়ুইগুলো উড়ে আসতে লাগলো সারা শহর থেকে। আর টপাটপ একের পর এক দালান তৈরী হয়ে গেলো।
সময় বয়ে চললো, কিন্তু আলফেসানীর নদী-লেক-তৈলচিত্র জনিত বিভ্রান্তি কাটলো না...

মুক্তগদ্যঃ বর্ষানগর

এপ্রিল ২০, ২০১২ - ১:১২ পূর্বাহ্ন

*
বর্ষানগরের কৃষ্ণচুড়ারা একে একে ফুটে চলেছে।
**
দুপুরের ঝলমলে রোদ ভেঙ্গে ছুটে যাওয়া রিকশার টুনটুন শুনে বুকের ভেতর চাপচাপ ব্যাথা জমা হতে থাকে। এমনই টুনটুন রিকশা ছুটে গিয়েছিলো যেদিন তুমি চলে গিয়েছিলে শহর থেকে। আমার নিজস্ব নগর থেকে। ভাঙা চুড়ির মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো শব্দগুলো এসফল্টের রাস্তা জুড়ে।
***
দূর আকাশের কোনে, একপাল কাফ্রী মেঘের মিটিং জমায়েত ছিলো সেদিন। তাই বুঝি বিদ্যুতের চাবুক হাতে নেমেছিলো সোনালী সন্ধ্যা। নিঃশব্দ চাবুক চমকাচ্ছিলো সুর্যকে ঘিরতে উদ্যত মেঘেদের পিঠে। নির্যাতনে অভ্যস্ত কাফ্রী মেঘেরা আনন্দে খলখল হেসে উঠছিলো থেকে থেকেই। আর বেড়ে চলছিলো সংখ্যায়।
****
শোঁশোঁ করে কাফ্রী মেঘদলের বন্ধু, বাউল বাতাস ছুটে এসেছিলো তখন। গাছের পাতায় কাঁপন তুলে উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলো তারা। মেঘদলের সাথে সংগত তুলছিলো রাস্তায় নানা শব্দের ওড়াওড়ি। বাউল বাতাসের বাঁশি শুনে চারদিক থেকেই দলে দলে ছুটে আসছিলো কাফ্রী মেঘের ঝাঁক। সুর্যের বিদায় নেবার আগেই তাকে ঘিরে ফেলেছিলো। স্বৈরাচারী সুর্যের দাপট কমিয়ে দিয়েছিলো এক লহমায়। শুধু সুর্যের বরকন্দাজেরা রয়ে গিয়েছিলো চাবুকের বিদ্যুৎ হাতে নিয়েই।
*****
চাবুকের আঘাত বেড়েই চলছিলো সময়ের সাথে সাথে। মেঘেদেরও ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে পড়ছিলো একটু একটু করে। তাই তারা মৃদু লয়ের গান শুরু করেছিলো বৃষ্টিছন্দের আড়ালে। বিদ্যুতের শপাং শপাং চাবুকের সাথে সাথে বাতাসের বাঁশি বেজেই চলেছিলো, আর জোর গলায় নামছিলো মেঘেদের উত্তাল গান।
******
কৃষ্ণচুড়ারা কাফ্রী মেঘদলের গান শুনে বদলে নিয়েছিলো নিজেদের চরিত্র। আর ঝুম বৃষ্টি নেমেছিলো সেদিন। এই বর্ষানগরের রোদজ্বলা পথ গুলো নিমেষেই হয়ে উঠেছিলো থই থই নদী...

ভুলে থাকা কালো বেড়ালের লোম কিংবা না পেয়েই হারাবার গল্প

 মার্চ ১৯, ২০১২ - ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন 

"তার" একটা ভুলে থাকা কালো বেড়াল আছে। যার বসবাস তার মনের অনেক ভেতরের একটা রোদক্লান্ত ব্যালকনিতে। বেড়ালটা বারবার ভুলে যায়, "সে" যে তাকে ভুলে থাকতে চায়। তাই আড়মোড়া ভেঙে সে উঠে আসতে চায় রোদক্লান্ত ব্যালকনি থেকে। তার অস্থির ছটফটানিতে রোদের দেয়ালে কোনো ছায়া পড়ে না। শুধু বাঁকা হয়ে পড়ে থাকা দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে কিছু বেড়ালের লোম ভেসে যায় এদিক সেদিক।
আলফেসানীর হাত ফস্কে পড়ে গিয়েছে অনেকখানি রঙ মাখা সময়। এই হারিয়ে ফেলা সময় গুলোকে সে রাখতে চেয়েছিলো নিজস্ব বাগানের ঘাসপাখিলতাপশুফুলে। বোঝেনি, নিজস্ব যে বাগানের ছবি সে এঁকেছিল, সেই ছবিটাতে বাস্তবতার তুলির আঁচড় দেবার কথা যে শিল্পীর সে আর তুলি হাতে নিতে অনিচ্ছুক। অনেক আগে শিল্পীর তুলির রঙ কেড়ে নিয়েছিলো যে তরুণ, তার কাছেই বাঁধা আছে শিল্পীর রঙীন রেখা গুলোও।
"তার" ভুলে যাওয়া কালো বেড়ালটা কিভাবে জানি আলফেসানীর রঙমাখা সময়ের দেখা পেয়েছিলো। উটকো দুধের পাত্র থেকে পড়ে যাওয়া দুধ ভেবে চেটেপুটে খেয়েও নিয়েছিলো সবগুলো সময়, রঙীন সময়। এরপরেই বেড়ালটা স্বভাবসুলভ ভাবে চলে গেলো "তার" কাছে। "তার" পায়ে গা ঘষটাতে ঘষটাতে আদুরে মিয়াও ডাক ছাড়তেই বদলে গেলো তার গলার সুর। "তার" চোখের তারাতেও পড়লো সেই রঙের ছায়া। আর রঙীন রেখার বিচ্ছেদের ফসল হিসাবে কালো বেড়ালটার স্থান হ'লো রোদক্লান্ত ব্যালকনিতে।
আলফেসানীও চাচ্ছে ভুলে থাকতে ফস্কে যাওয়া রঙ, সেই উটকো দুধ খাওয়া কালো বেড়াল আর সেই রঙীন রেখার বিচ্ছেদাক্রান্ত শিল্পীকে। ভুলে থাকার পথ ভেবে অস্থিরতা চাপা দিতে সে মিশে গেলো জনস্রোতে। উড়িয়ে দিলো হাজার হাজার ধোঁয়ার কবুতর। ছেঁটে ফেলে দিলো এলোমেলো বেড়ে ওঠা স্বপ্নের ডালপালাগুলোকে। জনস্রোতে তার চোখ ঝলসে যেতে থাকলো বহুবর্ণীল জামার ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বিবিধ রঙের ঝলকানিতে। কবুতরের পালকে পালকে খুজে পেতে থাকলো "তার" ভুলে থাকা কালো বেড়ালের লোম। স্বপ্নের ডালপালাগুলো বাড়তেই থাকলো অবিরাম।
"তার" ভুলে থাকা কালো বেড়ালটা অনভ্যাসে ভুলে গেছে আদুরে মিয়াও ডাকটা। শুধু রোদের দেয়ালে গা ঘষে, সে শুন্যে ছুড়ে দেয় তার গায়ের লোম। যেই লোম গুলো বাতাসে ভেসে "তার" রোদেলা মনের গহন থেকে উঠে আসতে আসতে বারবার রঙ বদলিয়ে চলে। একসময় হারিয়ে যায় নাগরিক জঞ্জালের সাথে। "তার" চোখে সেই রঙীন লোমের ছায়া পড়লেও ভুলে থাকার সর্বময় প্রচেষ্টা নামের ভুতটাই জিতে যায়।
আলফেসানী জানেনা তার সাথে রঙীন রেখার বিচ্ছেদাক্রান্ত শিল্পীর সাথে আবার কখনো হবে কি না হাঁটা, আবার কখনো দেখা হবে কি সেই উটকো দুধ খেয়ে নেয়া কালো বেড়ালের। তাই সে মনোযোগী হয়ে ওঠে একটা আয়নাঘর বানাবার প্রক্রিয়ায়। যে ঘরের নয়টি দিকেই থাকবে আয়নার কুহেলিকা। যাতে চোখ রেখে একা একাই সে ভেসে যাবে জনস্রোতে। যাতে দেখা যাবেনা কোনো রঙ, আর তাই মুহুর্তের অসাবধানতায়ও হাত ফস্কে রঙ পড়বেনা ছলকে। সেই ঘরে কোনো বেড়াল বা বিচ্ছেদাক্রান্ত শিল্পীর থাকবেনা প্রবেশাধিকার। আলফেসানীই কেবল কথা বলবে নিজের সাথে নাহয় অগুনতি আলফেসানীর সাথে।

জলপাই বনের আখ্যান

ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০১২ - ১১:৪১ পূর্বাহ্ন 

*
ধুসর গুবরেপোকাটা সেজেছিলো ফিরোজা সোনালী ডোরাকাটা রঙের সাজে।
**
জলপাই বনের স্নিগ্ধ সবুজে ঘুরতে এসেছিলো একটা নীল প্রজাপতি। সবুজগুলো আরো বেশী সবুজ হয়ছিলো সেই নীল প্রজাপতির আগমনী গানে। জলপাই বনের পাখিরা, কেউই দেখেনি গুবরেপোকার আনন্দ। শুধু রঙ মাতাল বসন্ত তার দারুচিনিগন্ধী হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছিলো এদিক ওদিক।
***
কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়াটে চাঁদের আলো ঈর্ষায় খয়েরী হয়ে যায়। জলপাই পাতাগুলি জড়োসড়ো হয়ে ওঠে সেই খয়েরী চাঁদের ঈর্ষায়। মৃদু আলোমাখা পথ ধরে ফিরে যেতে থাকে আনন্দের দল, আর অস্ত্র সজ্জিত বিষাদেরা এক এক করে দখল নিতে থাকে দারুচিনীগন্ধী হাওয়ার।
****
কাঠবাদামের হাল্কা সবুজ পাতাগুলোয় জমা হওয়া শিশিরবিন্দুরা একটা দু'টো করে ঝরে পড়তে থাকে লালচে ধুসর মেঠোপথে। বিষাদের দল শিশিরবিন্দুর ছোঁয়ায় বদলে যায় বিষণ্ণতায়। চাঁদের খয়েরী আলো ধীরে ধীরে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়। গাঢ়তর থেকে গাঢ়তম হয়। একসময় বুকভরা ঘনঘোর খয়েরী ঈর্ষা নিয়ে ডুবে যায় চাঁদ। রাত ঢেকে যায় অন্ধকারে।
*****
ঠিক, রাত তিনটা বেজে চব্বিশ মিনিটে খয়েরী ঈর্ষান্বিত চাঁদ চেপে ধরে গুবরেপোকার নাকমুখ।
******
জলপাই বনের আখ্যান, সমাপ্ত হবার একটা অনিবার্য কারণ আঁকা হয়ে গিয়েছিলো সেই সময়ের অনেক আগে থেকেই...

ফোনালাপ

 এপ্রিল ১৮, ২০১১ - ১:০৬ পূর্বাহ্ন

অনেক রাত। প্রায় আড়াইটা তিনটা হবে। পরিশ্রান্ত নায়ক গভীর ঘুমের রাজ্যে। উনি শুধু এই গল্পেরই নায়ক নন, উনি টিভি বা চলচ্চিত্রেরও নামকরা একজন অভিনেতা। তার বেড সাইড টেবিলে রাখা ফোন গুলোর একটা বেশ সুরেলা ভাবে গেয়ে উঠলো। রাতের শীতল নীরবতায় সুরেলা শব্দটাকে কর্কশ শোনালো। ঘুম ঘুম চোখে নায়ক ফোনটা হাতে নিলেন। কলারের নামটা দেখে নিমেষেই চোখ থেকে ঘুম ঘুম ভাবটা দূর হয়ে গেলো। শরীর ঢেকে রাখা কম্বলটা সরিয়ে তিনি সন্তর্পনে নেমে আসলেন বিছানা থেকে। পায়ের কাছে পড়ে থাকা গাউনটাকে জড়িয়ে চলে আসলেন পাশের ঘরে। আবছা আলোতে ঢেকে থাকা সোফাটাকে এড়িয়ে গেলেন বেড়ালের মত।
রিসিভ বাটনে চাপ দিতেই অপর পাশ থেকে ভেসে আসলো নায়লার অস্থির কণ্ঠ-
- হ্যালো। হ্যালো। কি হলো, কথা বলছো না কেনো? হ্যালো?
= কি হয়েছে জান? এখন কয়টা বাজে খেয়াল করেছো?
- কিজানি কয়টা বাজে, তুমি কি করছিলে? ঘুমাচ্ছিলে?
= অন্য কি করবো? তুমি কি পাশে আছো?
- যাও। সবসময় ফাজলামি
= কি হয়েছে বলতো? তোমার গলা কেমন অন্য রকম লাগছে।
নায়ক নিজের অভিনেতাসুলভ আচরণ এবং শব্দচয়নে মন দিলেন।
- কি হয়নি তাই বলো? ফারুক এসে উপস্থিত হয়েছে।
= ফারুক?
গলায় পর্যাপ্ত পরিমাণ বিস্ময় ঢেলে নায়কের প্রশ্ন।
= ও কিভাবে তোমার ঠিকানা পেলো?
এবার বিস্ময়ের সাথে উৎকণ্ঠা যোগ করা হলো।
- কিভাবে পেলো সেটা আমি কোত্থেকে জানবো? শুধু জানি রাত একটার সময় কলবেলের শব্দ শুনে, তুমি আমাকে সারপ্রাইজ দিতে এসেছো ভেবে দরজা খুলে দিয়ে দেখি ফারুক দাঁড়িয়ে। দাঁড়িয়ে বলা ভুল হবে, ও আসলে টলছিলো। মুখ থেকে ভুরভুর করে বেরোনো মদের গন্ধ নিয়ে টলছিলো।
= বলো কি?
- প্রথমেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুঁকে গেলো। তারপর ইনিয়ে বিনিয়ে কান্না। আমাকে ছাড়া নাকি বাঁচবে না। আবোল তাবোল। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে, আরো কত কি বলছিলো।
= তারপর?
- তারপর আর কি? যখন আমি বললাম যে ওকে ডিভোর্স দিয়ে দেবো। শুনে খেপে উঠলো। তারপর শুরু করলো আমাকে মারা।
= কি বলো? তোমার গায়ে হাত তুলেছে? এতবড় সাহস ওর?
কিছুটা উষ্মা যোগ হলো নায়কের কণ্ঠে।
- হু। মেরে কালশিটে ফেলে দিয়েছে।
= এখন? এখন কি করছে সে?
- হাতের সুখ মিটিয়ে এখন জ্ঞান হারিয়ে শুয়ে আছে মেঝেতে। আমি এখন কি করবো? যার ভয়ে শহরের এই মাথা থেকে ঐ মাথায় চলে আসলাম, তাই হ’লো।
নায়কের মাথার ভেতরের কলকব্জা গুলো পুরোদমে চালু হয়ে গেলো। সে যখন পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করতো তখন নায়লার সাথে পরিচয়। নায়লার ক্যারিয়ার তখন একেবারে মাঝ আকাশে। এই মেয়েটাকে জড়িয়েই তার নায়ক হিসেবে উত্থান। এই মেয়েটার সাহায্য না পেলে হয়তো তাকে এখনও পার্শ্বচরিত্রাভিনেতা হিসেবেই থেকে যেতে হ’ত। মেয়েটা যেমন তাকে সাহায্য করেছে উপরে উঠে আসতে তেমনই দেহমন উজাড় করে ভালওবেসেছে। কিন্তু তাকে সাহায্য করতে গিয়ে মেয়েটার নিজের ক্যারিয়ারে লেগেছে ভাটার টান, সংসারে জ্বলেছে আগুন। তারপরও সে নায়কের পাশে থেকেছে। এখন মেয়েটার ভয়াবহতম দুঃসময়ে তারে পাশে থাকা তো নৈতিক কর্তব্য।
- এই কি হ’ল? কিছু বলছো না যে?
= নাহ। আমি আসলে ভাবছিলাম কি করা যায়। আসলে কি করা উচিত।
- কিছু পেলে?
= পেয়েছি। কিন্তু তোমাকে বলতে ভয় হচ্ছে। তুমি মনেহয় আমার কথামত কাজ করতে পারবে না।
- বলেই দেখোনা। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি স-অ-ব।
= তুমি কি পারবে ফারুকের মুখের উপর একটা বালিশ চেপে ধরতে? তাহলে সারা জীবনের জন্য আমাদের পথের কাঁটা দূর হয়ে যাবে।
- কি বলছো এসব?
= আগেই বলেছিলাম পারবে না, আমাদের মনেহয় এভাবেই দূরে দূরে থাকতে হবে।
এবার নায়কের গলার স্বর থেকে বেদনা গলে গলে পড়লো।
- না। এভাবে বলোনা। তোমাকে না পেলে আমি মরেই যাবো।
= কিন্তু ফারুক বেঁচে থাকতে সেটা কি সম্ভব? কখনই সম্ভব না।
নায়কের গলা প্রায় কাঁদো কাঁদো।
- কিন্তু...
= এই দেখো, এখনও তুমি নিজের মনকে স্থির করতে পারছো না।
- আমার হাত কাঁপছে তোমার কথা শুনেই।
= থাক তাহলে।
নায়কের গলায় হতাশার সুর বাজলো।
- না...না... তুমি বলো কিভাবে কি করতে হবে।
= তোমার বিছানা থেকে বালিশটা তুলে নিয়ে গিয়ে ফারুকের মুখের উপর চেপে ধরো। মাত্র পাঁচ মিনিট। ব্যাস।
- কিন্তু... তুমি কি এরপর আমাকে আগের মত ভালবাসবে?
= কেন বাসবো না? আমি তো তোমার সাথেই আছি। আগেও ছিলাম, এখন এই কাজের সময়েও আছি।
নায়কের গলায় এবার ভালোবাসার বন্যা।
- এরপর ফারুকের লাশটা নিয়ে কি করবো বললে না যে?
= কম্বল দিয়ে লাশটা মুড়িয়ে তোমার গাড়িটায় তুলবে। তারপর গাড়িটা চালিয়ে নিয়ে যাবে পূর্বাচলের দিকে। ওখানকার ব্রিজটার উপর থেকে লাশটাকে নদীতে ফেলে দেবে। তারপর বাসায় চলে এসে সব কিছু ভুলে যাবে।
- আমি পারবো না। আমার হাত পা সব কাঁপছে।
= ঠিক আছে তাহলে, আমার কথা ভুলে যাও।
- না, না। আমি পারবো। আমাকে পারতেই হবে।
= এইতো লক্ষী মেয়ে। যাও আমি ফোন ধরে আছি।
এক দুই তিন চার এভাবে পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেলো। এই সময়ে নায়কের চেহারায় নানা রকম অনুভূতি তাদের ছাপ রেখে গেলো।
- হয়ে গেছে জান।
= তুমি আমার ঐ ফোনটাতে একটা রিং দাও। এটার চার্জ প্রায় শেষ।
নায়কের দ্বিতীয় ফোন এবার বেজে উঠলো। এবার নায়ক আগেই সেটার রিংগার অফ করে রেখেছিলেন।
- আমি... আমি ফারুককে মেরে ফেলেছি।
= এবার কি করবে?
- এবার লাশটাকে কম্বলে মুড়িয়ে গাড়িতে করে পুর্বাচলের ব্রিজের কাছে ফেলে আসবো।
= ভোর কিন্তু হয়ে আসছে।
- হ্যাঁ হ্যাঁ আমি যাচ্ছি।
= আমি ফার্স্ট ফ্লাইটেই চলে আসবো।
নায়ক এবার আরেকটা নাম্বারে ডায়াল করলেন।
= হ্যালো। গুলশান থানা? ওসি সাহেব বলছেন?
_ জ্বি বলছি।
= দেখুন আমি অভিনেতা মাহির হুসাম বলছি। কিছুক্ষণ আগে আমাকে আমার বন্ধু ফারুক এর স্ত্রী ফোন করেছিলেন। উনি বলছিলেন উনি নাকি আমার বন্ধু ফারুক কে খুন করেছেন। এখন নাকি নিজের গাড়িতে করে তার লাশ ফেলতে যাচ্ছেন পুর্বাচল ব্রিজের ওখানে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমি ব্যাপারটা আপনাকে জানানো কর্তব্য মনে করছি।
_ ঠিকাছে স্যার, আমি ব্যাপারটা দেখছি। আপনি আমাকে শুধু বাসার ঠিকানাটা বলুন।
অনেক দিনতো নায়লার সাথে কাটলো। এবার তার এগিয়ে যাবার পালা, কে পুরোনো গ্ল্যামারলেস নায়িকার সাথে বাকি জীবন কাটাবে?
নায়ক কথা শেষ করে আগের সেট থেকে সিম বের করে ভেঙ্গে ফেলে বাথরুমে গিয়ে ফ্ল্যাশ করে দিলেন। তারপরে শোবার ঘরে ফিরে গাউন খুলে আবার কম্বলের তলে ঢুকে পরলেন।
পাশ থেকে মেয়েটা জিজ্ঞাসা করলো “কে ছিলো মেয়েটা?”
নায়ক বললেন “মেয়ে না তো, এক প্রযোজক। উনার সাথে একটা সিনেমার ডিল পাকা করলাম”।
মেয়েটা মৃদু হাসির সাথে বললো “এই না, না। ওখানে না। যাহ।”
ধীরে ধীরে দুজনের নিঃশ্বাস ঘন হয়ে আসলো।

অসংলগ্ন

জুলাই ২০, ২০১০ - ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

কানাই ঘটক তার অস্থিসার পিঠটাকে টিনের মতো দেয়াল বা দেয়ালের মতো টিনের সাথে ঠেকিয়ে একটু ঝিমিয়ে নিচ্ছিলো। পায়ের সামনে লাঠিটাকে আড়াআড়ি করে রেখে নিয়েছিলো যাতে কুকুর এবং অন্যান্য নাগরিক পশুরা হুমড়ি খাবার আগে, একটু হলেও বিভ্রান্ত হয়।
আরে, এই বুড়োর চেহারার সাথে মহাত্মা গান্ধীর চেহারা হুবুহু মিলে যায়। দুর্ভাগ্য যে গান্ধী কোনো ধর্মের প্রেরিত পুরুষ না। নয়তো কানাই ঘটকের ভেতর গান্ধীর পুনঃজন্ম ঘটেছে বলে কিছু টু-পাইস কামিয়ে নেয়া যেতো।সশব্দে "ধুর বাল" বলে নিজের চিন্তাকে চুপ করিয়ে আলফেসানী পায়ের কাছে পড়ে থাকা কিছু একটার ক্যানের উপর লাথি কষিয়ে দিলো।
কানাই ঘটকের শরীরে জড়িয়ে নেবার মতো অনেক কিছুই ছিলো এই শহরের আনাচে কানাচে। কিন্তু সেই জিনিস গুলো কিনবার মতো যেই রঙীন কাগজের টুকরোগুলোর প্রয়োজন তারই অভাব ছিলো।(সে যাই হোক। কানাই ঘটকের অভাব অভিযোগের কথা আপাততঃ একটা পাশে সরিয়ে রাখাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।) তো খালি গায়ের কানাই ঘটক, যখন ঝিমুনির ভিতরে রাস্তা দিয়ে চলতে থাকা গাড়ি গুলোর শব্দকে সেতার-সারেঙ্গী-তবলার বোল মনে করে মৃদু সুখস্বপ্নের দিকে এগোচ্ছিলো সেই সময়েই লাঠির ব্যারিকেডকে আলতো ভাবে পাশ কাটিয়ে আলফেসানীর লাথি কষানো ক্যানটা এসে তার কপালের কোনায় লাগলো। ক্যানের শব্দ না কানাই ঘটকের সুখস্বপ্ন ভেঙ্গে যাবার শব্দ বলতে পারি না, তবে শব্দ একটা হ'লো। ঘষাটে কাঁচের চোখ খুলেই ঘটক বাবু হাতের লাঠিটা নিয়ে একটা লাঠিয়ালে পরিণত হয়ে গেলো। ভিটে বাঁচানোর আকাঙ্খায় উন্মত্ত কানাই লেঠেল একটা মোক্ষম মার দিয়ে বসলো। নাগরিক পশুটা কেঁউ জাতীয় একটা শব্দ করে পড়ে যাবার সাথে সাথেই কানাই লেঠেল তার হাতের লাঠিটা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়লো মজা দেখতে আসা অন্যান্য নাগরিক জন্তুগুলোর উপরে।
_______________________________________________________
অনেক দিন ধৈরা মাথার ভিত্রে লাইন কয়টা আটকায়া ছিলো। আইজকা বাইর কৈরা দিলাম।

এলোমেলো মুক্তগদ্য

এপ্রিল ২৬, ২০১০ - ১২:০৪ অপরাহ্ন 

।।
*
গদ্য কেনো বন্দী হয়ে থাকবে? তার ডানাগুলো তো কেটে নেয়া হয়নি? তাকে তো কোনো খাঁচায় আটকে রাখা হয়নি? তাহলে কেনো থাকবে সে বন্দী হয়ে? স্বাধীন গদ্যরা ডানা মেলুক চাঁদের অপর পৃষ্ঠায়। হেঁটে বেড়াক বৃহঃস্পতির সবচে বড় উপগ্রহে, জমাট বরফের হ্রদে।
**
যত গাঢ় হ'তে থাকে অন্ধকার, ততই খুলে যেতে থাকে রাতের গভীরে ঢুকবার দরজাগুলো। একেকটা দরজা পার হ'লে দেখা যায় অন্ধকারের বহুবর্ণিল রূপ। চাঁদের রুক্ষ দৃষ্টিতেও নেমে আসতে থাকে কোমলতা। বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি ঝরে। চাঁদ ও মানুষের যুগলবন্দী মনে।
***
সন্ধ্যা চুপিচুপি হেঁটেছিলো রাতের অভিসারে। আর তাই চাঁদগুলো লাল হয়েছিলো লজ্জায়। দুপেয়ে জীবেরা এমন দেখেই অভ্যস্ত, তাই তারা নিজেদের কাজেই ব্যাস্ত ছিলো। সেজন্য অনায়াস নির্লিপ্ততায় ঝরে গেলো একাধিক শিশুর কুমারীত্ব।
****
অর্জুণ ও কৃষ্ণরা শেষপর্যন্ত বিজয়ীর বেশে ফুলের মালা-টালা গলায় পড়ে ফিরে আসে। মৃত আত্মীয়দের শোক চেপে প্রজারাও তাদের নামে জয়ধ্বণি দিতে বাধ্য হয়। মুলতঃ শ্রেষ্ঠ তীরন্দাজের সাথে স্বর্গের শ্রেষ্ঠ অধিবাসীরাও সদ্ভাব রাখতে আগ্রহী, তবেই না নশ্বর ধরায় তাদের সাম্রাজ্য চালানো কন্টক মুক্ত থাকবে।
*****
একটু বাতাস হলেই ধুলো ওড়ে। দৃষ্টি খানিকটা ঝাপসা হয়ে আসে। বাতাস কমলে ধুলোরা থিতিয়ে আসে বিভিন্ন টেবিল আর লেখার উপর। হাতে ময়লা লাগার ভয়ে ধুলোও মোছা হয়না, লেখার চরিত্ররাও আর জেগে ওঠেনা।
******
খানিকটা অহংকার কেনো জানি জমে আছে মনের পিরিচে। ফেলে দেই, দিচ্ছি করে ফেলে দেওয়াও হচ্ছে না। আবার ঠিক এড়িয়েও যাওয়া যাচ্ছে না। কিভাবে যে জমা হ'লো তার হদিসও পাওয়া যাচ্ছে না। ধুর! নিজের উপরই বিরক্ত লাগছে।

সোমবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৩

মেয়েটা নদীকে “মা” ডাকতো

মার্চ ৮, ২০১০ - ২:২৫ পূর্বাহ্ন 

_________________________________________________________
অনেকদিন আগে এপু যখন কবিতাটা লেখে, আমি কথা দিয়েছিলাম এটাকে ভিত্তি করে আমি একটা গদ্য লিখব। নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। কালকে ওর কবিতাটা আবার দেখে, দেয়া কথাটা রাখার কথা মনে হ’লো। জানিনা কতটা এক্সেপ্টেবল হবে। তবে এপু যদি বলে গদ্যটা তার কাছে আপ টু দ্য মার্ক হয় নি, তাহলে আমি এটাকে ড্রাফট করে ফেলব।
কারণ, গল্পের ভিত্তি হচ্ছে তার কবিতা।

_________________________________________________________
মেম্বার বাড়ির উঠোন ঘেঁষে ঋজু দাঁড়িয়ে
থাকা শিমুল গাছটা থেকে তুলো বাতাসের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ভেসে যাচ্ছে। ত্বকে পলিমাটির মাধুর্য নিয়ে তুলোর পিছু পিছু ছুটছে মেয়েটা। গেঁয়ো পথটা পার হয়ে একটা
পেঁজা ঘুরে গেল, যেন হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকা কাশবনের ডাক উপেক্ষা করার উপায় জানা নেই তার। কিংবা তার সাথে উচ্ছসিত ছুটে বেড়ানো কিশোরীর মনের সাথে তার অলৌকিক
যোগাযোগ ঘটে গেছে। কিশোরী চোখে জেগেছে অতীতের ঘোর।
কত বয়স হবে মেয়েটার? দশ? নাকি এগার? বয়স যাই হোক, এখনই সারা দুনিয়ার সব দুঃখকে চিনে নিয়েছে সে। ভুল হ’লো। সব দুঃখ কষ্ট না, যেহেতু শরীরের বাঁক গুলো এখনো ভরাট হয়ে ওঠেনি, সেহেতু নারী জন্মটা নিয়ে বিতৃষ্ণা জাগা অভিজ্ঞতা হয়নি তার।
বাবার কথা তার মনে তেমন ভাবে মনে নেই। শুধু মনে আছে; যখন তাদের একটা ঘর ছিলো, একচিলতে দাওয়ায় বসে মা কাঁথার জমিনে সুঁই সুতোয় নকশা ফুটিয়ে তুলতো প্রতি বিকেলের রোদে হেলান দিয়ে, সে সময় একজন এসে দাঁড়াতো মায়ের সামনে। এক হাতে খলুই নিয়ে এঁটেল মাটি রঙের লোকটা যখন নিজের শরীরের দ্বিগুন লম্বা ছায়াটা ফেলত
মায়ের পায়ের উপর, মায়ের মুখে অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠতো কোনো কারণ ছাড়াই। মনে আছে, কোন এক পরবে বাবা নামের লোকটা তার জন্য টুকটুকে লাল জামা কিনে এনেছিলো যা যখের ধনের মত আগলে রেখেছিলো সে। একদিন বিকালে লোকটা তার শরীরের দ্বিগুন ছায়াটা আর মায়ের পায়ের উপর ফেলেনি। আরো কয়েকজন মিলে তার শরীরটাকেই এনে রেখেছিলো তাদের উঠোনে, সেদিন আর তার শরীর এঁটেল মাটির রঙ ধরে রাখতে পারেনি, হয়ে গিয়েছিলো রাতের মত কালো। মায়ের মুখের অদ্ভুত আলোটা মরে গিয়েছিলো সেদিন থেকেই।
মা......মা......মা......
ডাকতে ডাকতে মেয়েটা ছুটে চলেছে নদী তীরের কাশবন ধরে।
মা ই ছিল তার জীবন, আর ছিলো বাবাই। বাবা মারা যাবার কিছুদিনের ভিতরেই বাবাই বের হয়ে এসেছিল তার মায়ের ভিতর থেকে। মা যখন কাজে যেত, বাবাই কে দেখে
রাখার দায়িত্ব দিয়ে যেত তাকে। আস্তে আস্তে সে নিজে হয়ে উঠতে থাকে বাবাইয়ের আরেক মা। তার ছোট্ট জীবন্ত পুতুল ছিলো বাবাই। রাতে মায়ের দু’পাশে ঘুমাতো দু’জন। ঘুমের
ঘোরে মায়ের হলুদ-নুন গন্ধী আঁচলটাকে সে আঁকড়ে ধরত বারেবার। গন্ধটা তাকে নির্ভরতা এনে দিতো। মেম্বারের বাসায় কাজ সেরে মা যখন খাবার নিয়ে ফিরত, সারাদিনের গল্পের খই
ফুটতো তার মুখে। চাহিদা খুব বেশি ছিলো না তার। সকালে নুন-পান্তাতেই মন ভরে যেতো, কখনও মায়ের কাছে আবদার করতো ট্যাংরা মাছের চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খাবার। বিলাসিতা, বলা
যেতে পারে। বাবাইকে কাঁখে নিয়ে সে মাঝে মাঝেই ছুটে যেতো নদীর ধারে। দাঁতে একটা কাশের ফুল কামড়ে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকত। এঁটেল মাটিতে আঁকিবুকি কাটতো পায়ের
বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে। কখনো ফুল, কখনো মাছ, কখনো হিজিবিজি। আকাশে উড়ে বেড়ান পাখিও আঁকার চেষ্টা করেছে অনেকবার। একবার বাবাইয়ের পা বেয়ে উঠে এসেছিলো একটা জোঁক। একটুও ভয় পায়নি সে। হাতে থাকা বড়ই খাবার নুনটা জোঁকের মুখে দিয়ে দিতেই টুপ করে খসে
পড়েছিলো জোঁকটা।
আজকেও গিয়ে বসেছে সে নদীটার ধারে। কাশবন ধরে আসার পথে তার নির্ভরতার গন্ধে মনটা মৌ-মৌ করে উঠছিলো। নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে তার মনে হচ্ছে মায়ের আদর মাখা স্পর্শ তার পা দু’টো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছে। অনেকদিন আগের মত করে সে নদীর কাছে আবদার করছে তার প্রিয় বিলাসিতার। চোখ বেয়ে নামছে আষাঢ়ের বৃষ্টি।
এমনি এক বৃষ্টির রাতে। ঝুম বৃষ্টি। মায়ের ফিরে আসতে দেরি হচ্ছে দেখে বাবাইকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ানি গান গেয়ে চলছিলো মেয়েটা। আকাশের বুক ফেঁড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিলো আর বাবাই বারবার কেঁপে উঠছিলো। মেয়েটারও বুকের ভিতর দুরুদুরু করছিলো কি জানি কি আশংকায়। মা ফিরে এসেছিলো অনেক দেরি করে। ভিজে একশা। মেয়েটাকে বলেছিলো “জাইগা থাকিসরে মা, আইজকা রাইতে আকাশ মাডি ভাইঙ্গা বান আইতে পারে”। মেয়েটা জেগেই ছিলো। কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি তার মা কে জেগে থাকতে দেয় নি। বাবাইকে বুকে
জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। অনেক রাতে গুমগুম করে শব্দ শুনে মেয়েটা বিছানার কোনায় বসে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মা কে ডেকে তুলেছিলো ঘুম থেকে। কাঁচা ঘুম থেকে জেগে উঠে মা কোনো দিশে খুঁজে পাচ্ছিলো না। একহাতে বাবাইকে জড়িয়ে আরেক হাতে মেয়ের হাত ধরে দৌড়
দিয়েছিলো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। মাটিও কাঁপছিলো, যেনো ভয়ে। হঠাৎই পিছল রাস্তায় মায়ের পা হড়কালো। বাবাই ছিটকে পড়েছিলো মায়ের হাত থেকে। মেয়েটাকে মা হিজল গাছটার
কাছে ঠেলে দিয়ে আকাশ চেড়া বিদ্যুতের আলোতে দেখতে পেলো বাবাই একটু দূরে মাটির উপর শুয়ে আছে। দৌড়ে সেখানে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে হিজল গাছটার দিকে পা বাড়াতেই কড়কড় শব্দে কাছে কোথাও বাজ পড়ল, তার আলোতে চারদিক দিনের মত উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। আর তার সামনেই হাঁ করে বাবাই আর মা কে গিলে নিলো নদীটা।
মেয়েটা এখন নদীকেই মা বলে ডাকে। কিন্তু মা সাড়া দেয় না।

হাতুড়ে গদ্য (সাদা-কালো-লাল-নীল)

ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০১০ - ২:৪২ অপরাহ্ন 

লাল
টেলিফোনটা
বেজে উঠল। লাল টেলিফোন। সবে লাল রঙ জমে উঠছিল চোখের তারায়, এর ভেতরেই লাল
টেলিফোনটা বেজে উঠে সব ভজঘট বাধিয়ে দিলো।
অভিজাত
লেকটার পাড়ে অস্তরাগের সব লাল শরীরে মেখে পড়ে আছে একটা কিশোরী। তার পরিধেয় জুড়ে
ফুটে রয়েছে একঝাঁক লাল ফুল। গলা ঘিরে লাল লাল দাগ দেখা যাচ্ছে। অবিশ্বাস্য ভাবে
তার ঠোঁট দু’টো একেবাররেই অক্ষত আছে, সেখানে জ্বল জ্বল করছে টুকটুকে লাল লিপস্টিক।
আকাশের
লাল রঙ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। ইষৎ লাল আকাশের নীচে গাঢ় লাল টেইল লাইট
জ্বেলে শাঁ শাঁ করে ছুতে যাচ্ছে একাধিক গাড়ি।

সাদা
সকালটা শুরু হয়েছিলো ধবধবে সাদা মন নিয়ে। মনের রঙের সাথে জামার রঙটাও
মিলে গিয়েছিলো জুঁই নামের কিশোরীর। প্রতিদিনকার মতই সে হেঁটে গিয়েছিলো বহুচর্চিত
পথ ধরে। শুভ্র সকালের আনন্দে সে ভুলে গিয়েছিলো গত বিকেলের স্মৃতি।
দুপুর হয় হয়, ঝকঝকে রোদে বড় বড় বাড়িগুলো থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো
অলৌকিক সাদা আলো। সব শুভ্রতাকে নিজের সাথে নিয়ে জুঁই পথ চলছিলো। একটা ধবধবে সাদা
গাড়ি হঠাৎই এসে থেমেছিলো তার পাশে। সেই সাদা গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে এসেছিলো
দুপুরের অলৌকিক শুভ্র আলোতে।

নীল
আকাশে একটুও মেঘ নেই। জানালা দিয়ে একটুকরো নীল আকাশ দেখা যাচ্ছে। যে
ঘরে সে আছে, সেই ঘরের দেয়াল, আসবাব সবই নীল। নীল ঘরের এক কোনায় আতংকে নীল হয়ে বসে
আছে মেয়েটা।
নীলচে লাইটের আলোতে তিনটে নীল শরীর দেখা যাচ্ছে বসে আছে নীচু একটা
টেবিলকে ঘিরে। নীল বেডকভার ঢাকা বিছানাতে একজন শুয়ে আছে। যার হাতের সিগারেট থেকে
নীলচে ধোঁয়া পাক খেতে খেতে উড়ে যাচ্ছে নীল সিলিং এর দিকে। দু’জন উঠে দাঁড়াল।
মেয়েটা নীলতর হয়ে উঠলো। আতংকের সাথে যোগ হয়েছে বেদনার নীল।

কালো
ছেলেটার মনে ছিলো মহাবিশ্বের অন্ধকার। যখন যেদিকে সে দৃষ্টি দিয়েছে,
সেদিকেই ছড়িয়ে গিয়েছে কালো রঙ। মেয়েটাকে সে উপহার দিতে চেয়েছিল কালো র‌্যাপিং মোড়া
অন্ধকার। কালো উপহারের প্রত্যাখ্যান তার ভেতরের কালোর উপর আরো কয়েক পোঁচ কালির পরত
ছড়িয়ে দিয়েছিলো।
মনের অন্ধকার কোণে জেগে উঠেছিলো কালো দানবেরা।

সাদা-কালো-লাল-নীল

গাঢ় আঁধারে ডুবে যাওয়া জুঁইগুলো
সকল সুগন্ধ অতিক্রম করে ঝরে পরে
এলোমেলো হয় জোছনাবিলাসী একদল যুবকের পদক্ষেপ
বিভ্রান্ত নীলাভ ছড়িয়ে পড়ে বিরাজমান সন্ধ্যার লালে।

হাতুড়ে গদ্য (বারেকের টিভি)

ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০১০ - ১২:১৭ অপরাহ্ন

বাজারের ঠিক শেষ মাথায় বারেকের চা’র দোকানটা। মৃত্যুর দিন গুনতে থাকা বুড়ো বাবলা গাছটা দাঁড়িয়ে এতদিন ধরে কিছু মানব শিশুর বিভিন্ন উচ্চতার অত্যাচার সহ্য করে আসছিল। তার চিরল পাতার ছায়ার নাগালের ভিতরেই বারেক দোকানটা শেষ পর্যন্ত বসিয়েই ফেলল। মফস্বলের এই মৃতপ্রায় বাজারে দোকান বসানোর মত নির্বুদ্ধিতা নিয়ে বাজারের লোকেরাও বারেককে কম খোঁচায়নি, সে নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। সাধারন চা’র দোকানগুলো যেমন হয় বারেকের দোকান তা থেকে উন্নত কিছুই না। বরং খরচ কমানোর জন্য কেরসিন স্টোভের বদলে মাটির চুলা বসিয়েছে, যেটা ধরাতে তাকে প্রতি ভোরেই নাকাল হতে হয়। তবে একটা বিশেষত্ব আছে তার দোকানে। সেটা আর কিছুই না, একটা ১৪ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি। যার এন্টেনাটাকে একটু কায়দা করে, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ডিশের তারের সাথে প্যাঁচ খাইয়ে দেয়া হয়েছে।
অলস দুপুরের বাবলার চিরল ছায়ায় হেলান দিয়ে অনেকেই বসে থাকে। এককাপ চায়ের সাথে একটা টোস্ট বা একটা বন নিয়ে মুলতঃ টিভির অনুষ্ঠানই সবাই খেতে পছন্দ করে। হয়ত কখনো কোন নায়কের রিকশা চালাতে চালাতে শিল্পপতির মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক তাদের হাতে থাকা শুকনো বিস্কুটকে ক্রীমের নরম আবরণে ঢেকে রাখে। নয়ত কোন গানের দৃশ্য দেখে পাশে বসা জনের পিঠে থাবা দিয়ে “মাগীর দুধ দুইটা দেখছোস? শালার অক্করে গাছপাকা আমের লাহান” বলে উত্তেজনা প্রশমণের ব্যর্থ চেষ্টায় জোরে জোরে চায়ের কাপে চুমুক দেয় কেউ। এই চুমুকের সময়ই অনেকে খেয়াল করে তাদের কাপে আর তলানি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। ফের জমিয়ে বসে লুঙ্গির খুট থেকে কেউ কেউ বিড়ি বের করে, কেউ বের করে খুচরো টাকা।
মাঝ সকালে আসেন কিছু বয়স্ক মানুষ। তাদের কারো মুখে তৃপ্তির আলো ঝলমল করে, কারো মুখে ভরসা হারানো আঁধারের ছোঁয়া। তাঁরা বসেন, এক বা দুই কাপ চা খান। টিভিতে দেখায় মিছিল, নাটক, রাস্তায় জ্বলতে থাকা আগুন কিংবা দেখায় রাজধানীর কোনো বড় দালানে ঢুকতে বেরোতে থাকা মানুষ। বয়স্ক চা প্রেমীরা তাকিয়ে থাকেন চুলোয় জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে টিভিতে দেখাতে থাকা বিবিধ সাদাকালো আগুনের সাথে বাস্তবের রঙ্গিন আগুনকে মিলিয়ে দেখেন। কখনো কাশির দমকে বাঁকা হতে হতে বারেককে আরেকটা আদা চা’র অর্ডার দেন কেউ। কেউ বা বাবলার শরীরে, মধ্যমায় লেগে থাকা চুনের শেষাংশ মুছতে মুছতে রক্তের মত পানের পিক ছুড়ে দেন রাস্তার ধুলোর দিকে।
নানা বয়েসী শিশুরা প্রায় সারাটা দিনই আশেপাশে খেলা ধুলা করে। আর বড়দের উচ্চারিত নানান শিক্ষা জমা রাখতে থাকে মগজের বিভিন্ন কুঠুরীতে। মাঝে মাঝেই সেগুলোর সফল প্রয়োগ চলে অপেক্ষাকৃত কম শক্তির অধিকারীর উপরে। কখোনো সখোনো দোকানে আসার উপলক্ষ্য পেলে মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে থাকে সাদাকালো শিশু বা বয়স্ক লোকেদের দিকে। কচি মনে হয়তো সাদাকালো আর রঙ্গীন বাস্তবের পার্থক্য করতে পারে না। তাদের বিস্ময় হয়ত এতটুকুই যে, এত সুন্দর করে সেজে থাকা মানুষ গুলোর মুখ বা জামা-কাপড়ে আমাদের মত রঙের ছোঁয়া নেই কেন?.
সন্ধ্যায়, দোকানীরা তাদের পসরা বন্ধ করে ঘরে ফেরার আগে, পারস্পরিক বিকি-কিনির তুলনা মূলক আলোচনার জন্য আসে। আসলে প্রতক্ষ্য আলোচনার থেকে বেশি প্রাধান্য পায় চা’র সাথে সাথে টা’র বিল দেবার সময়কার পরোক্ষ লাভ-ক্ষতির বিবরণ। এখানেও স্পষ্টতঃ দু’টো শ্রেণী দেখা যায়। যাদের সামর্থ কম তারা বেশী সময় নষ্ট না করে কোনোমতে এককাপ চা খেয়ে চলে যায়। যাবার আগে অবশ্য টিভির সাদাকালো ছবির সাথে নিজেদের সাদাকালো জীবনের মিল দেখে একটু হাসির রঙ মনের ভিতর নিয়ে ঘরে ফিরে যায়। আর দ্বিতীয় শ্রেণীটা বেশ আয়েশ করে অনেক সময় নিয়ে চা খায়। সাথে টিভির সাদাকালো রঙ এর দিকে খানিকটা উপহাস নিয়েই তাকিয়ে থাকে।
রাত অনেকখানি গভীর হলে ঝলমলে গাঢ় রঙ এর জামা-কাপড় পরা কিছু মেয়ে দোকানের আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করে। তাদের কেউ কেউ এসে বসে দোকানে। তবে তারা শুধু চা’ই খায়। শুন্য দৃষ্টিতে তারা সাদাকালো টিভির মানুষ গুলোর সাথে সাথে নিজেদের কৃত্রিম রঙ্গীন সাজ আর তাদের ক্রেতাদের ভেতরের কালো চাহিদাটাকে মেলাবার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
বারেক নিজে কখনো আগ্রহ নিয়ে তার সাদাকালো টিভির দিকে তাকায় না। সে বরং তার খদ্দেরদের মনের ভিতরের নানা রঙের খেলা যেভাবে মুখের পর্দায় ফুটে ওঠে তা নিয়েই মগ্ন থাকতে ভালবাসে। দোকানের ঝাঁপ নামাতে নামাতে বারেক ডাক দেয় “আয় আয়... তু তু তু”। কোথা থেকে জানি একটা কুকুর ছুটে আসে, বাসি বনরুটি গুলো সামনে নিয়ে কৃতজ্ঞতার রঙ ছড়িয়ে দেয় রাতের অন্ধকারে। দোকানের ভিতরে শুয়ে বারেক অনুভব করতে থাকে সাদাকালো জীবনে রঙের খেলা গুলো।

হাতুড়ে গদ্য (ক্যাকফনি)

জানুয়ারী ৩০, ২০১০ - ২:১৮ পূর্বাহ্ন 

সন্ধ্যার ঝিম ধরানো সিগন্যালে; এলোমেলো কিন্তু সারিবদ্ধ ঝিঁঝিঁ পোকাগুলোর চিৎকার শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ আলফেসানী, কানে ইয়ার-প্লাগের হোসপাইপ লাগিয়ে মগজের শুকনো জমিতে কিছু শব্দ আর ছন্দের চাষে ব্যাস্ত ছিলো। হঠাৎই রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে স্মৃতির কলসি ভেঙ্গে একঝাঁক কোমল ছবি ছড়িয়ে ফেলল এদিকে সেদিকে।
-----------
চন্দ্রলোপার ছিপছিপে শরীরটা জড়িয়ে আছে দুধসাদা কামিজ যার উর্বর জমিন জুড়ে অসংখ্য সীমের ফুল। আংগুলের সকল মমতা দিয়ে ধরা কালো কালির একটা বলপয়েন্ট। একচিলতে বিকেলের রোদ তার চুল আর চোখের কার্ণিশ বেয়ে নেমে এসে খাতার এক কোণে লক্ষী বেড়াল হয়ে বসেছে।
------------
বেশ অনেকদিন ধরেই হাল্কা ধুসর মনখারাপের ধুলো জমা হচ্ছে আলফেসানীর ঘরের মেঝেতে। আজকে সেখানে ঢুকে দেখলো আনন্দের পায়ের ছাপ গুলো প্রায় অদৃশ্য হয়ে এসেছে। কোনায় কোনায় বাস্তবতার মাকড়শার ঝুলে ছেয়ে গিয়েছে। চোখ বন্ধ করে এগুলোই দেখছিলো সে। হয়ত ঘরে ঝুলিয়ে রাখা কোমল ছবিগুলোও খুঁজে ফিরছিলো।
-----------
সন্ধ্যাভিমুখী মৃদু আলোর রাস্তায় চন্দ্রলোপা আর তার সাথীদের সামনে দিয়ে উদাসীন ভঙ্গীতে হেঁটে যেতে যেতে; সদ্য যৌবন ছোঁয়া ঠোঁটে, শো-অফের চিন্তায় উদ্বিগ্ন ধোঁয়ার আড়াল তৈরী করা। সাথে আড়চোখে চন্দ্রলোপার চোখের কুঁড়ির পূর্ণাঙ্গ ফুলে পরিণত হয়ে ওঠা উপভোগ।
------------
আলো-আঁধারীতে যে আবছা বয়েসের আদল ফুটে উঠেছে তাতে মেয়েটার চন্দ্রলোপা না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কিছুক্ষণ আগের অবস্থান থেকে পেটমোটা রিকশাটা এগিয়ে আসাতেই এই বিপত্তিটা দেখা দিয়েছে। আলফেসানীর তখনকার মোলায়েম মাটির হৃদয়ে যেই কোমল ছবিগুলো আঁকা হয়েছিলো সেগুলোর বয়েস একবিন্দুও বাড়েনি। রিকশায় বসে থাকা চন্দ্রলোপাও সেই সদ্য যৌবনের সবটুকু গৌরব নিয়ে অবিচল।
আলফেসানীর একই সাথে খুব ইচ্ছে হচ্ছে পিপড়ের পেটের ভিতর থেকে বের হয়ে এই চন্দ্রলোপার সাথে পরিচিত হতে, আবার মনের গহীণ কুয়ার ভেতর থেকে পুরোনো চন্দ্রলোপার প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। যেই শব্দের প্রতিটা ছোঁয়া মনখারাপের ধুলো পড়া ঘরের কোমল ছবিগুলোর স্পটলাইট এক এক করে জ্বালিয়ে তুলছে।
________________________________________________________________
**cacophony -
1. harsh discordance of sound; dissonance: a cacophony of hoots, cackles, and wails.
2. a discordant and meaningless mixture of sounds: the cacophony produced by city traffic at midday.
3. Music. frequent use of discords of a harshness and relationship difficult to understand.
_________________________________________________________________

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১০

মেরুদন্ডের ভিসকসিটি বা সিঁড়ি বেয়ে উঠার গল্প

আমাদের মেরুদন্ড চা'য়ে ভেজানো এনার্জি প্লাস বিস্কুট হয়ে উঠতে থাকে, আর আমরা দিন দিন বাঁকা হয়ে যাই। আমাদের পায়ের নিচে মাটি অবশ্য শক্তইতথাকে। তার উপর ইট-বালু পড়ে, পিচ কিংবা কংক্রীট ঢালাই হয়। শক্ত মাটিতে আমরা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুর, আমাদের অর্ধতরল কশেরুকাগুলো দিয়ে তার সিঁড়ির ডেকোরেশন করে। আমরা তখন ঘেসো জমি থেকে কেলে ভুতদের শ্যাওড়া গাছ কেড়ে নিতে ব্যাস্ত থাকি।

কখনো সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে আমাদের দেখা হয়। তখন হয়তো সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। আমরাও তার সাথে গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে থাকি। আমাদের জন্য তার পায়ে তখন অফুরান সময়। তার হাতে যখন চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেট বের হয়ে আসে, তখন হয়তোবা আমাদের ঘাড় লম্বা হয়ে ওঠে, ছোবল উদ্যত সাপের মত। উৎসুক চোখগুলো হামলে পড়ে ওয়ালেটের এখানে সেখানে। নিপুন বীণবাদক যেমন বীণের সুরে সাপকে সম্মোহিত করে রাখে, তেমনি ওয়ালেটের দেয়ালে সাজানো বিভিন্ন ব্যাংকের সোনালী বা প্লাটিনাম তৈলচিত্রে আমরাও সম্মোহিত হয়ে পড়ি। আমাদের সহসা কঠিন ভারটেব্রা আবারো অর্ধতরল হয়ে পড়ে।

সিঁড়িবাজ মানসুরের ছুঁড়ে দেয়া উচ্ছিষ্ট নিয়ে আমরা ফিরে আসি শক্ত বা নরম মাটিতে। আর মানসুর মনোযোগ দেয় সিঁড়ি বেয়ে উঠায়। আমরা রাস্তার পাশের পিঠার দোকানে হাঁটুমুড়ে বসি, দোকানীর সাথে আলগা খাতির জমানোর চেষ্টা করি। মরিচ ভর্তা দিয়ে পিঠা খেতে খেতে শব্দ করে শ্বাস নেই। শ্বাসের সাথে মরিচের সব ঝাল টেনে নেই ভিতরে, এই ঝাল আমাদের মেরুদন্ডকে আরো খানিকটা বিষাক্ত করে। গলিত মেরুদন্ডের বিষ নিয়ে আমরা শক্ত মাটিতে দাঁড়াই। ডানপাশের খোলা দেয়ালটার সামনে গিয়ে পেশাব করি। তারপর গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করি। রাতের গভীরতা পর্যাপ্ত ঘণত্বে পৌঁছুলে বাঁয়ের খাল ঘেষা বাঁশের কাঠামোগুলোয় আমাদের মেরুদন্ডীয় বিষ ঢেলে দেই। বিষের কমলা সোনালী রঙ ছড়িয়ে পড়ে সারাটা বামপাশ জুড়ে। আমরা শক্ত মাটির উপর গড়িয়ে গড়িয়ে দুর থেকে আরো দূরে সরে যেতে থাকি।

আমরা বারেকের দোকানে চা খেতে যাই। আমাদের হাতে থাকে এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস বিস্কুট। আমরা চা'য়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে তাকিয়ে থাকি বারেকের সাদা-কালো টিভির দিকে। যখন আমাদের বিস্কুটের কথা খেয়াল হয়, ততক্ষণে চা'য়ের কাপের তলায় বিস্কুটটা ঘর-বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। আমরা খুব উৎসাহের সাথে সেই ঘণ চা'তে চুমুক দেই। গলিত, অর্ধতরল বিস্কুটের ভেতর আমরা একটা হলেও শক্ত দানা খুঁজে পেতে চাই।

সিঁড়িবাজ মানসুর যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে, তখন তার চোখকে ঘিরে থাকে সানগ্লাস। সেটা এতই গাঢ় রঙের, যে সিঁড়ির সাজসজ্জা তার চোখের কোনো অংশকেই আঘাত করতে পারে না। গাঢ় সানগ্লাস পড়ে সে আমাদের মাড়িয়ে চলে যায়। আমরা তার চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেটের তৈলচিত্র দেখতে পাইনা। আমাদের সম্মোহন কেটে যেতে থাকে। আমরা বারেকের দোকানে ফিরে আসি। এইবেলা আমাদের হাতে এনার্জি প্লাসের প্যাকেট থাকে না। আমরা চা'য়ে সস্তার টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে ডুবে যাই সাদা-কালো টিভিতে। যখন বিস্কুটের কথা মনে পড়ে, তখন সমগে স্মৃতি জুড়ে এনার্জি প্লাস। আমরা চা'য়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঘণ তরল পাই না, বরংকিচছুটা নরম টোস্ট বিস্কুট আমাদের হাতে রয়ে যায়। অনভ্যস্ত আমরা সেই টোস্ট বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে থাকি। মুখে পুরে চিবানোর সময় আমরা টের পাই বিস্কুটের কেন্দ্রে কিছুটা মচমচে ভাব। আমাদের বাঁকা পিঠ খানিকটা সোজা হয়ে অঠে। ওদিকে পিচ কিংবা কংক্রীটের জমিতে ফাটল ধরে।

আমরা আস্তে আস্তে চা'য়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া ভুলতে থাকি। আমাদের নরম পিঠ দৃঢ় হয়ে উঠতে থাকে। আমরা নরম মাটিতেও খাড়া দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে পাশে পাশে আমরাও সিঁড়ি বেয়ে উঠা শিখি। আমরা একদল ছেলেকে চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া শেখাতে থাকি।

সিঁড়িবাজ মানসুর একদিন পা হড়কে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়। তার সিঁড়ির অর্ধতরল সাজে খাদ ঢোকে। আমরা সতর্ক হতে শিখি। সিঁড়িবাজ মানসুরের পরিণতিই আমাদের সতর্ক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমরা সিঁড়ি বানানো বাদ দিয়ে লিফট তৈরীতে মনোযোগ দেই। যদিও আমরা ভিতরে ভিতরে অনুভব করতে পারি লিফটও আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা নতুন একদল মানুষ সংগ্রহ করি। যারা চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খেলেও সেটাকে অর্ধতরল হতে দেয় না। তাদের দাঁত শক্ত বিস্কুট খাবার উপযোগী। আমরা তাদের পাশে নিয়ে লিফটে ঢুকি। কয়েকতলা পর্যন্ত তারা আমাদের সাথী হয়, তারপর আমাদের সম্মান দেখাতে লিফট থেকে নেমে দাঁড়ায়। আমরা আরো কয়েকতলা উঠে যাই। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমাদের লিফট শ্যাফট জুড়ে অনেক সিঁড়িবাজ মানসুর পড়ে রয়েছে। আমরা নির্লিপ্ত ভাবে কফিতে চুমুক দেই আর এনার্জি প্লাস বিস্কুটের প্যাকেট উড়ে বেড়ায় আমাদের ঘিরে।