মঙ্গলবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

অনার্দ্র পঞ্চস্বর

এই পথে,
পড়ে থাকে হলদে আভা মাখা মায়াময় সকাল
নাগরিক ব্যস্ত পায়ে দলিত।

এই পায়ে,
জড়িয়ে থাকা বেদনার ধুসর মেঘ
ধুয়ে যায় প্রাত্যহিক অবহেলার অঞ্জলিতে।

এই হাতে,
ছায়া ছায়া ছাপ আঁকা আলোর দেয়াল
সহস্র চূর্ণ হয়ে যায় মিথ্যে শ্লোগানে।

এই কণ্ঠে,
সারাটা রাতের অন্ধকার ঘুমিয়ে পড়ে একসময়
জেগে থাকে অনার্দ্র পঞ্চস্বর।

শুক্রবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১০

অস্থির পংক্তিগুলো

*
আমার ঘরের দেয়ালে হাঁটু গেড়ে বসে আছে পোষা পাপ
ডায়েরীর পাতায় থাকা নানা বর্ণের অক্ষরগুলো ভীড় করছে তার চারপাশে,
আগুনের আকর্ষণে যেমন ছুটে আসে মৃত্যুপায়ী বোকা পোকারা।

আমি আগুনের কারবারি, কাগজের ঘরে বসে তৈরী করি লাল-নীল-সাদা-কালো আগুন।

**
ডানা মুড়ে বসার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে দেশান্তরী পাখির দল,
আমরাও অপেক্ষায়।
এদিকে শান পাথরের শরীর গরম হয়ে উঠছে ধারালো ধাতবের আনাগোনায়।

***
সুরক্ষিত সময়
হাত ফসকে পড়ে গেলো পানিতে
চমকে,
উড়ে গেলো একঝাঁক জোনাকী আর আলেয়ার আভা।

****
গোধুলীর আলো ছায়া ফেলে যায় জন্মান্ধ ঘোলাটে মণিতে
তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের স্পর্শে জাগে জলের জীবন।

সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১০

মেরুদন্ডের ভিসকসিটি বা সিঁড়ি বেয়ে উঠার গল্প

আমাদের মেরুদন্ড চা'য়ে ভেজানো এনার্জি প্লাস বিস্কুট হয়ে উঠতে থাকে, আর আমরা দিন দিন বাঁকা হয়ে যাই। আমাদের পায়ের নিচে মাটি অবশ্য শক্তইতথাকে। তার উপর ইট-বালু পড়ে, পিচ কিংবা কংক্রীট ঢালাই হয়। শক্ত মাটিতে আমরা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুর, আমাদের অর্ধতরল কশেরুকাগুলো দিয়ে তার সিঁড়ির ডেকোরেশন করে। আমরা তখন ঘেসো জমি থেকে কেলে ভুতদের শ্যাওড়া গাছ কেড়ে নিতে ব্যাস্ত থাকি।

কখনো সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে আমাদের দেখা হয়। তখন হয়তো সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। আমরাও তার সাথে গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে থাকি। আমাদের জন্য তার পায়ে তখন অফুরান সময়। তার হাতে যখন চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেট বের হয়ে আসে, তখন হয়তোবা আমাদের ঘাড় লম্বা হয়ে ওঠে, ছোবল উদ্যত সাপের মত। উৎসুক চোখগুলো হামলে পড়ে ওয়ালেটের এখানে সেখানে। নিপুন বীণবাদক যেমন বীণের সুরে সাপকে সম্মোহিত করে রাখে, তেমনি ওয়ালেটের দেয়ালে সাজানো বিভিন্ন ব্যাংকের সোনালী বা প্লাটিনাম তৈলচিত্রে আমরাও সম্মোহিত হয়ে পড়ি। আমাদের সহসা কঠিন ভারটেব্রা আবারো অর্ধতরল হয়ে পড়ে।

সিঁড়িবাজ মানসুরের ছুঁড়ে দেয়া উচ্ছিষ্ট নিয়ে আমরা ফিরে আসি শক্ত বা নরম মাটিতে। আর মানসুর মনোযোগ দেয় সিঁড়ি বেয়ে উঠায়। আমরা রাস্তার পাশের পিঠার দোকানে হাঁটুমুড়ে বসি, দোকানীর সাথে আলগা খাতির জমানোর চেষ্টা করি। মরিচ ভর্তা দিয়ে পিঠা খেতে খেতে শব্দ করে শ্বাস নেই। শ্বাসের সাথে মরিচের সব ঝাল টেনে নেই ভিতরে, এই ঝাল আমাদের মেরুদন্ডকে আরো খানিকটা বিষাক্ত করে। গলিত মেরুদন্ডের বিষ নিয়ে আমরা শক্ত মাটিতে দাঁড়াই। ডানপাশের খোলা দেয়ালটার সামনে গিয়ে পেশাব করি। তারপর গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করি। রাতের গভীরতা পর্যাপ্ত ঘণত্বে পৌঁছুলে বাঁয়ের খাল ঘেষা বাঁশের কাঠামোগুলোয় আমাদের মেরুদন্ডীয় বিষ ঢেলে দেই। বিষের কমলা সোনালী রঙ ছড়িয়ে পড়ে সারাটা বামপাশ জুড়ে। আমরা শক্ত মাটির উপর গড়িয়ে গড়িয়ে দুর থেকে আরো দূরে সরে যেতে থাকি।

আমরা বারেকের দোকানে চা খেতে যাই। আমাদের হাতে থাকে এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস বিস্কুট। আমরা চা'য়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে তাকিয়ে থাকি বারেকের সাদা-কালো টিভির দিকে। যখন আমাদের বিস্কুটের কথা খেয়াল হয়, ততক্ষণে চা'য়ের কাপের তলায় বিস্কুটটা ঘর-বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। আমরা খুব উৎসাহের সাথে সেই ঘণ চা'তে চুমুক দেই। গলিত, অর্ধতরল বিস্কুটের ভেতর আমরা একটা হলেও শক্ত দানা খুঁজে পেতে চাই।

সিঁড়িবাজ মানসুর যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে, তখন তার চোখকে ঘিরে থাকে সানগ্লাস। সেটা এতই গাঢ় রঙের, যে সিঁড়ির সাজসজ্জা তার চোখের কোনো অংশকেই আঘাত করতে পারে না। গাঢ় সানগ্লাস পড়ে সে আমাদের মাড়িয়ে চলে যায়। আমরা তার চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেটের তৈলচিত্র দেখতে পাইনা। আমাদের সম্মোহন কেটে যেতে থাকে। আমরা বারেকের দোকানে ফিরে আসি। এইবেলা আমাদের হাতে এনার্জি প্লাসের প্যাকেট থাকে না। আমরা চা'য়ে সস্তার টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে ডুবে যাই সাদা-কালো টিভিতে। যখন বিস্কুটের কথা মনে পড়ে, তখন সমগে স্মৃতি জুড়ে এনার্জি প্লাস। আমরা চা'য়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঘণ তরল পাই না, বরংকিচছুটা নরম টোস্ট বিস্কুট আমাদের হাতে রয়ে যায়। অনভ্যস্ত আমরা সেই টোস্ট বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে থাকি। মুখে পুরে চিবানোর সময় আমরা টের পাই বিস্কুটের কেন্দ্রে কিছুটা মচমচে ভাব। আমাদের বাঁকা পিঠ খানিকটা সোজা হয়ে অঠে। ওদিকে পিচ কিংবা কংক্রীটের জমিতে ফাটল ধরে।

আমরা আস্তে আস্তে চা'য়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া ভুলতে থাকি। আমাদের নরম পিঠ দৃঢ় হয়ে উঠতে থাকে। আমরা নরম মাটিতেও খাড়া দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে পাশে পাশে আমরাও সিঁড়ি বেয়ে উঠা শিখি। আমরা একদল ছেলেকে চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া শেখাতে থাকি।

সিঁড়িবাজ মানসুর একদিন পা হড়কে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়। তার সিঁড়ির অর্ধতরল সাজে খাদ ঢোকে। আমরা সতর্ক হতে শিখি। সিঁড়িবাজ মানসুরের পরিণতিই আমাদের সতর্ক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমরা সিঁড়ি বানানো বাদ দিয়ে লিফট তৈরীতে মনোযোগ দেই। যদিও আমরা ভিতরে ভিতরে অনুভব করতে পারি লিফটও আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা নতুন একদল মানুষ সংগ্রহ করি। যারা চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খেলেও সেটাকে অর্ধতরল হতে দেয় না। তাদের দাঁত শক্ত বিস্কুট খাবার উপযোগী। আমরা তাদের পাশে নিয়ে লিফটে ঢুকি। কয়েকতলা পর্যন্ত তারা আমাদের সাথী হয়, তারপর আমাদের সম্মান দেখাতে লিফট থেকে নেমে দাঁড়ায়। আমরা আরো কয়েকতলা উঠে যাই। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমাদের লিফট শ্যাফট জুড়ে অনেক সিঁড়িবাজ মানসুর পড়ে রয়েছে। আমরা নির্লিপ্ত ভাবে কফিতে চুমুক দেই আর এনার্জি প্লাস বিস্কুটের প্যাকেট উড়ে বেড়ায় আমাদের ঘিরে।

অশিরোনাম পংক্তিমালা

.
.

ঝির ঝির বৃষ্টি পড়ছে সেই সকাল থেকে।

তিনটা কাক,
একটা শালিক
আর পাঁচটা চড়ুই
বসে আছে কার্ণিশে।

হুশ, বলতেই উড়ে গেলো মেঘেরা।

কেউ কি আমাকে একটু সূর্যোদয় ধার দেবে?
বুকপকেটে রাখা চিঠির সাথে গেঁথে দিতাম...

মঙ্গলবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১০

আয়নাতে নেমে আসা রাত

চোখ ভরা বিষণ্ণ এলকোহল।

জোনাকীর ডানা ছুঁয়ে আসে উৎসব বৃত্তান্ত।

ফলশ্রুতিতে;

গৃহীনি চিবুকের অনুলোম জুড়ে রঙ্গীন তুষার জমে,
কাঁধ খসা আগ্রহী শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে
ঘৃণিত বেড়ালের আনাগোনা চলে অবিরাম।

মসৃণ উরু বেয়ে উঠে আসতে থাকে নিয়নের আলো
কামতপ্ত মেক-আপ বক্সের শীৎকার,
ছড়িয়ে পড়ে তাপানুকুল ঘরে
আর, ড্রেসিং টেবিলের ফুলেল অরণ্যে।

আলোর পথচলা থেমে যায় একে একে।

আদিগন্ত আয়না জুড়ে নেমে আসে রাত।

রবিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১০

মুক্তগদ্য- জলের দেয়াল

*
অস্তিত্ব ঘিরে জলের দেয়াল ভেঙ্গে গড়ে ওঠা চলে অবিরাম।
**
মাঠের মাঝখানটায় আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে আলফেসানী। স্মৃতির প্রজাপতিরা উড়ে উড়ে বেড়ায় তার চোখের তারায়। রঙ ছড়িয়ে যায় অন্ধকার রাতের আকাশে আকাশে। তরুণ অতীতের রঙগুলো গাঢ় আর গ্লসি, ওদিকে বৃদ্ধ অতীত হালকা রঙের সাজে। স্মৃতির সাথে টুকটাক কথা বিনিময়, ভাব বিনিময় করে চলে বর্তমান আলফেসানী।
কুকুরেরা ঘুরে ঘুরে আসে, কানে কানে কিছু বলতে চায়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালী রুপালী পাখিদের দরদাম জানায় দুর্বোধ্য ভাষায়। ঘাসের সমুদ্রে প্রাণপনে হাত নেড়ে আলফেসানী কুকুরদের সান্নিধ্য থেকে সাঁতরে চলে যেতে থাকে দূরে, কিন্তু কুকুরগুলো জেলে হয়ে ছুঁড়ে দেয় জাল। তাদের খলুইয়ে রাখা রুপালী ইলিশ কিংবা তেল চকচকে সোনালী আভা মাখা মাছগুলো বিক্রি করতে উদগ্রীব।
***
হইহই করে, মিছিলের মত বর্তমান এসে হামলে পড়ে কাঁচের জানালায়। ভেঙ্গে পড়া জানালা দিয়ে রঙ্গীন প্রজাপতিরা উড়ে পালায়। ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোয় আলতো পা ফেলে আসে সোনালী রুপালী রঙের পাখি কিংবা মাছেরা। কষ্টার্জিত স্ব-ইচ্ছায় খুলে ফেলে পালকের কিংবা আঁশের আভরণ। তাকিয়ে থাকে মৃত চোখ নিয়ে, নিভন্ত শরীর নিয়ে।
****
সস্তা চুনকামের গন্ধ নিয়ে দেয়ালের গায়ে লেপ্টে থাকে চাঁদ। ঘোলাটে জোছনা ঢেকে রাখে পাখি কিংবা মাছেদের ঠেলে ওঠা হনু, বহু ব্যবহারে জীর্ণ স্তন। অনিবার্য অভ্যস্ততা পাখি কিংবা মাছেদের দ্রুততার সাথে চলতে বলে। আলফেসানী জাগিয়ে তুলতে চায় বহুদিনের ঘুম পাড়িয়ে রাখা পশুটাকে। জাগেনা পশুটা, ভোরের মিস্টি গান গেয়ে জেগে ওঠেনা সূর্যটাও।
এক-এক ফোঁটা করে জল জমেছিলো অস্তিত্বের চৌহদ্দিতে। প্রজাপতির ডানা থেকে খসে পড়া রঙগুলোকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিলো দেয়াল। অগুনিত দেয়াল। টোকা দিলেই ভেঙ্গে পড়ে, আবার নতুন করে গড়ে ওঠে নিমেষেই। দেয়ালের ধার ঘেঁষে চুপকরে বসে থাকে চন্দ্রলোপা। দেয়ালের ভিতর দিয়ে তাকিয়ে থাকে বন্দী পশুটার দিকে। চন্দ্রলোপার চোখে চোখ পড়লেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
*****
চন্দ্রলোপার দূরে থাকা, অস্তিত্ব জুড়ে জলের দেয়ালের ভাঙ্গা-গড়াতেই আলফেসানীর সুখ।

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১০

সময়ের অধরা অস্তরাগ

আকাশের বুকে লেখা ছিলো দিকভ্রান্ত নাবিকের দিনলিপি
আর শর্মিষ্ঠার ছায়া আঁকিবুকি কাটছিলো পীরেনীজের গিরিখাতে।
তুমি, খুঁজে চলেছো সময়ের অস্তরাগ
টুকরো করে কাটা পতঙ্গের পুঞ্জাক্ষীতে।

কিছু পরে, হেঁটে যাবে উড়ুক্কু মাছের দল
পাখা গুলো জমা রেখে যাবে ব্যাংকের সুরক্ষিত ভল্টের আলোময়তায়।
সমুদ্রে ঠাঁই পাওয়া আটলান্টিসের পিছু নিয়ে
আরো কিছু গাংচিল নেমে যাবে অতল গভীরতার ভালোবাসায়।

তখনো তোমার খুঁজে ফেরা শেষ হবে না, সময়ের প্রান্তভাগ।

পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বিষাদগুলো
বিস্মরিত অতীতে, আনন্দে রূপান্তরিত হয়ে চলে অবিরাম।
সমতলে ছড়িয়ে থাকা মেঘকণা
অশ্রু হয়ে উড়ে যায় বৃক্ষের সবুজে।

তখন, সময়ের গোধুলী নেমে আসে তোমার দু'চোখ জুড়ে।