রবিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১০

মুক্তগদ্য- জলের দেয়াল

*
অস্তিত্ব ঘিরে জলের দেয়াল ভেঙ্গে গড়ে ওঠা চলে অবিরাম।
**
মাঠের মাঝখানটায় আকাশের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে আলফেসানী। স্মৃতির প্রজাপতিরা উড়ে উড়ে বেড়ায় তার চোখের তারায়। রঙ ছড়িয়ে যায় অন্ধকার রাতের আকাশে আকাশে। তরুণ অতীতের রঙগুলো গাঢ় আর গ্লসি, ওদিকে বৃদ্ধ অতীত হালকা রঙের সাজে। স্মৃতির সাথে টুকটাক কথা বিনিময়, ভাব বিনিময় করে চলে বর্তমান আলফেসানী।
কুকুরেরা ঘুরে ঘুরে আসে, কানে কানে কিছু বলতে চায়। অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সোনালী রুপালী পাখিদের দরদাম জানায় দুর্বোধ্য ভাষায়। ঘাসের সমুদ্রে প্রাণপনে হাত নেড়ে আলফেসানী কুকুরদের সান্নিধ্য থেকে সাঁতরে চলে যেতে থাকে দূরে, কিন্তু কুকুরগুলো জেলে হয়ে ছুঁড়ে দেয় জাল। তাদের খলুইয়ে রাখা রুপালী ইলিশ কিংবা তেল চকচকে সোনালী আভা মাখা মাছগুলো বিক্রি করতে উদগ্রীব।
***
হইহই করে, মিছিলের মত বর্তমান এসে হামলে পড়ে কাঁচের জানালায়। ভেঙ্গে পড়া জানালা দিয়ে রঙ্গীন প্রজাপতিরা উড়ে পালায়। ভাঙ্গা কাঁচের টুকরোয় আলতো পা ফেলে আসে সোনালী রুপালী রঙের পাখি কিংবা মাছেরা। কষ্টার্জিত স্ব-ইচ্ছায় খুলে ফেলে পালকের কিংবা আঁশের আভরণ। তাকিয়ে থাকে মৃত চোখ নিয়ে, নিভন্ত শরীর নিয়ে।
****
সস্তা চুনকামের গন্ধ নিয়ে দেয়ালের গায়ে লেপ্টে থাকে চাঁদ। ঘোলাটে জোছনা ঢেকে রাখে পাখি কিংবা মাছেদের ঠেলে ওঠা হনু, বহু ব্যবহারে জীর্ণ স্তন। অনিবার্য অভ্যস্ততা পাখি কিংবা মাছেদের দ্রুততার সাথে চলতে বলে। আলফেসানী জাগিয়ে তুলতে চায় বহুদিনের ঘুম পাড়িয়ে রাখা পশুটাকে। জাগেনা পশুটা, ভোরের মিস্টি গান গেয়ে জেগে ওঠেনা সূর্যটাও।
এক-এক ফোঁটা করে জল জমেছিলো অস্তিত্বের চৌহদ্দিতে। প্রজাপতির ডানা থেকে খসে পড়া রঙগুলোকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছিলো দেয়াল। অগুনিত দেয়াল। টোকা দিলেই ভেঙ্গে পড়ে, আবার নতুন করে গড়ে ওঠে নিমেষেই। দেয়ালের ধার ঘেঁষে চুপকরে বসে থাকে চন্দ্রলোপা। দেয়ালের ভিতর দিয়ে তাকিয়ে থাকে বন্দী পশুটার দিকে। চন্দ্রলোপার চোখে চোখ পড়লেই ঘুমিয়ে পড়ে সে।
*****
চন্দ্রলোপার দূরে থাকা, অস্তিত্ব জুড়ে জলের দেয়ালের ভাঙ্গা-গড়াতেই আলফেসানীর সুখ।

বৃহস্পতিবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১০

সময়ের অধরা অস্তরাগ

আকাশের বুকে লেখা ছিলো দিকভ্রান্ত নাবিকের দিনলিপি
আর শর্মিষ্ঠার ছায়া আঁকিবুকি কাটছিলো পীরেনীজের গিরিখাতে।
তুমি, খুঁজে চলেছো সময়ের অস্তরাগ
টুকরো করে কাটা পতঙ্গের পুঞ্জাক্ষীতে।

কিছু পরে, হেঁটে যাবে উড়ুক্কু মাছের দল
পাখা গুলো জমা রেখে যাবে ব্যাংকের সুরক্ষিত ভল্টের আলোময়তায়।
সমুদ্রে ঠাঁই পাওয়া আটলান্টিসের পিছু নিয়ে
আরো কিছু গাংচিল নেমে যাবে অতল গভীরতার ভালোবাসায়।

তখনো তোমার খুঁজে ফেরা শেষ হবে না, সময়ের প্রান্তভাগ।

পৃথিবীর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বিষাদগুলো
বিস্মরিত অতীতে, আনন্দে রূপান্তরিত হয়ে চলে অবিরাম।
সমতলে ছড়িয়ে থাকা মেঘকণা
অশ্রু হয়ে উড়ে যায় বৃক্ষের সবুজে।

তখন, সময়ের গোধুলী নেমে আসে তোমার দু'চোখ জুড়ে।

রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১০

তাহলে অন্য কিছু করি আজকে

তাহলে আজকে বন্ধ থাকুক আমাদের সেল ফোন গুলো
অশ্লীল সুরে বেজে ওঠা রিং টোনের শব্দ;
সার্বক্ষণিক অভিনয় শিল্প, বিশ্রাম নিক নির্ভয়;
ছুটে আসা ক্ষুদে বার্তা গুলো, পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াক এদিক-ওদিক।

আমরা তবে আজ চাঁদের সাথে কথা বলব চিৎকার করে
ছুটে যাবো ঘাসের শরীর মাড়িয়ে
খোলা হাওয়ায় উড়িয়ে দেবো ওড়না কিংবা টি-শার্টগুলোকে
কাশের মোলায়েম স্পর্শ নেবো নগ্ন বুকে
ধুয়ে ফেলবো সকল কালিগোলা চিন্তার পুঁথি-পত্র
ছিন্নভিন্ন করে ফেলবো সব সামাজিক বাঁধন
হাসবো অনর্গল।

প্রতিদিনের রঙ মাখা মুখোশের আড়ালে ঝরে পড়া হাসি কান্না
একদিনের জন্যে হলেও তুলে রাখব আলমারির গোপনতম ড্রয়ারে
আমরা আবার ফিরে যাবো সেই অনাবিল সময়ের কোলে
আবার রঙ মেখে মুখোশ জড়ানোর প্রাণশক্তির জোগাড়ে।

শুক্রবার, ২২ অক্টোবর, ২০১০

এলোমেলো পংক্তিমালা

টলমলে চোখ নিয়ে পরিযায়ী পাখির দল
উড়ে চলে মেঘের গা ঘেঁষে
ধবল পাখায় মুছে নেয় মেঘের শরীরে মাখা রক্ত ছাপ।

অতীত দুঃস্বপ্নেরা
হামাগুড়ি দিয়ে উঠে আসতে চায় জেগে ওঠা চরের বালিতে।

হেঁটে যায় ঘনঘোর কুয়াশা
হাতে নিয়ে আলেয়ার আগুন
চকচক করে চোখ ও ধারালো অস্ত্র।

ঘিনঘিনে অনুভুতি চামড়ার উপরে ও নীচে।

টুপটাপ ঝরে পড়ে সাতমাথা সাপের পান্নাস্পর্শী অশ্রু।

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১০

ঈশ্বরের পোর্ট্রেট বিষয়ক ভাবনা

প্রসঙ্গতঃ
হৃদপিন্ড ছিঁড়ে নেয়া হবে কিছু পাখির
এবং উৎসর্গ করা হবে শস্যমূলে

সরীসৃপ গোত্রের কিছু প্রাণী
সুশৃংখল মিছিল নিয়ে হেঁটে যাবে
মনের অলি-গলিতে

মাছেদের কৌমার্য দলিত হবে
সামুদ্রিক কচ্ছপের কামোন্মাদনায়

তারপর, ঈশ্বরের পোর্ট্রেট আঁকা হবে চাঁদের ঘরে বসে।

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০১০

শিরোনামহীণ অন্ধকার

নোনা ধরা দেয়ালে সেইসব চোখ
নানা রঙ্গীন আলো ফেলে চলে।

উড়ে চলে যায় সাদা তেলাপোকার দল
সারি সারি খোলস ফেলে রেখে
মেঝে আর দেয়ালের মোহনায়।

ঘুম ঘুম দিন জুড়ে সামরিক পিপড়ের দল
হেঁটে বেড়ায়,
অসুস্থ্য আঙ্গুলের ঘ্রাণে সম্মোহিত বরফকুচি ও কনিয়াক গ্লাস
ছায়া ফেলতে থাকে মানবিক চোখের নীচে।

সন্তানেরা একে একে নেমে যায় মৃত্যুর অতলে
নরমুন্ড শিকারীর উল্লাস
ছড়িয়ে যায় সবুজ ঘাসের মেঘে
নদীরা জেগে ওঠে রক্ত পান করে।

বিছানায়, চাদরে লেখা থাকে নির্জীব প্রাণীজ সঙ্গম।

বুধবার, ৬ অক্টোবর, ২০১০

****

*
ছন্দবদ্ধ কার্ণিশ বেয়ে নেমে আসে হলদে রোদ। ঘাম জমে ওঠে শরীর সমতল জুড়ে। ঘোলাটে মনের আনাচ কানাচে যেসব ঘাসের বসবাস, তারা আলোড়িত হয় বাতাসের প্রতীক্ষায়। বাতাসের সাথে ডুমুর ফুলের বন্ধুতা বাড়ে। মুখে হাসি, চোখে জল নিয়ে এলোমেলো উড়ে যায় নাগরিক কাকের দল।

**
ছন্নছাড়া। ছন্নছাড়া।
জীবন নিয়ে হেঁকে চলে ফেরিওয়ালা। কিনবার মত লোক খুঁজে ফেরে এখানে ওখানে। মেলেনা। চাহিদা নেই তাই ছন্নছাড়া জীবন পড়ে থাকে টিনের কৌটোতে কিংবা বাঁশের ঝাঁকায়। শোঁ শোঁ করে গাড়ি হাঁকায় গোছানো জীবনের বিক্রেতারা। তাদের কাঁচের শো-কেসে রাখা প্রোডাক্টের চাহিদা প্রচুর। সারাক্ষণ সারিসারি ক্রেতাদের আসা-যাওয়ায় মসৃণ হতে থাকে কংক্রীটের আবরণ।

***
আয়নায় তাকিয়ে চোখ রাঙানী দেখি নিজের। নাঃ। রাতজাগা ক্লান্তি ভর করা নেই চোখে, নেই ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। খুব সাধারণ একটা অসুখ ভর করেছে চোখে। সময়টাই এরকম। চোখের অসুখ, মনের অসুখ খুব সহজেই সংক্রমিত হয়ে পড়ে। চোখ থেকে চোখে। মন থেকে মনে।

****
একটা সময়ের পরে বিবাহিতদের ভিতরে আর আবেগ টিকে থাকে না। দু'জন দু'জনকে মানসিক ভাবে ঘায়েল করার চেষ্টায় মেতে থাকে সারাক্ষণ। এই আমি ছুঁড়ে দিচ্ছি কথা, দেখি কেমন তোমার এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা? সময় পার হয়। স্বর পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকে। একপর্যায়ে অত্যাধিক উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতা জনিত কারণে থেমে যায় দু'টো স্বর ই। জমে ওঠে নীরবতার বরফ।